মঙ্গলবার ২১ নভেম্বর ২০১৭


সু চির ইমেজ বৃদ্ধির দায়িত্ব বাংলাদেশের!


সংবাদ সমগ্র - 19.10.2017

গোলাম মোর্তোজা : বাংলাদেশের কূটনীতি নিয়ে সব সময়ই সমালোচনা আছে। সমালোচনা আছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের দূতাবাস নিয়েও। খুব সরল একটি সমালোচনা আছে, রাষ্ট্রদূতরা দেশের পক্ষে দায়িত্ব পালন করেন না। তারা চাকরি করেন, দেশের অর্থে বিলাসী জীবনযাপন করেন। নিশ্চয়ই কথাটা সব ক্ষেত্রে সত্যি নয়। আবার একেবারে সে অসত্যি, তাও নয়। অনেকটাই সত্যি, প্রায় সবাই মানবেন- বিশেষ করে যারা বিদেশে দূতাবাস বা রাষ্ট্রদূতদের কাজ দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

আজকের আলোচনার বিষয় কূটনীতি বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনীতি। আরও সরাসরি বলি, গত ১৮ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে যে কথাগুলো বলেছেন, তার প্রেক্ষিতে কিছু কথা।
০১.
‘সু চি সংবেদনশীল মানুষ’- এই বক্তব্য সু চির কোনও মন্ত্রীর বা সু চির কোনও জনসংযোগ কর্মকর্তার নয়। একথা বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চির কোন কথা বা কাজের মধ্য দিয়ে ‘সংবেদশীলতা’র প্রকাশ ঘটল? সু চির কাজ বা কথার দিকে নজর দিয়ে দেখা যাক।
ক. রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ শুরু করার পর সু চি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন। গণহত্যা বন্ধ করা তো দূরের কথা, রোহিঙ্গাদের প্রতি সামান্যতম সমবেদনারও প্রকাশ ছিল না। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা তখন বাংলাদেশে চলে এসেছে। ভাষণে সু চি বলেছেন, কেন রোহিঙ্গা মুসলিম যুবকেরা বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
পরবর্তীতে সারা পৃথিবী জানল, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে-হত্যাকাণ্ড চালিয়ে, নারীদের ধর্ষণ করে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী। সে পরিকল্পনা সু চির অজানা থাকার কথা নয়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই তিনি জানতেন না, তাহলেও পরবর্তীতে সারা পৃথিবীর সঙ্গে তিনি নিজেও জেনেছেন। গণহত্যা-ধর্ষণ বন্ধ করা বিষয়ে একটিও কথা বলেননি। ‘৫ অক্টোবরের পরে সামরিক অভিযান চলছে না’- সু চির এই বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য হিসেবে প্রমাণ হয়েছে। আজকেও সামরিক অভিযান, হত্যা-দমন-পীড়ন চলছেই। রোহিঙ্গাদের ঢল আসছেই।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর মধ্যে ‘সংবেদনশীলতা’র কী দেখলেন? সু চি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চেয়েছেন- পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায় এটাই ‘সংবেদশীলতা’। যদিও সু চির বক্তব্য এটা নয়। সু চি বলেননি ‘রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে’ নেবেন। সু চি বলেছেন, ‘যাচাই-বাছাই’ করে যারা ‘মিয়ানমারের নাগরিক’ তাদের ফিরিয়ে নেবেন। আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। তাদের কাছে নাগরিকত্বের কোনও প্রমাণ নেই।
‘যাচাই-বাছাই’এ তো প্রমাণ হবে না যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। ফিরিয়েও নেবে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলার সময় ‘ফিরিয়ে নিতে চেয়েছেন’ বলছেন, ‘যাচাই-বাছাই’ শব্দ দুটি বলেননি। কেন বলছেন না? রহস্যাটা কোথায়? সু চি ‘সংবেদনশীল’ এটা প্রমাণ করার দায়িত্ব কেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়েছেন?
খ. সু চিকে দেওয়া সম্মানসূচক নাগরিকত্ব ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে কানাডার পার্লামেন্টে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সু চিকে দেওয়া শাখারভ পুরস্কার প্রত্যাহারের কথা ভাবছে। ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলো সু চিকে দেওয়া সম্মান প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো সু চির তীব্র নিন্দা করছে। অ্যামনেস্টি ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সরাসরি সু চিকে গণহত্যার সহায়ক ও মিথ্যাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করছে তথ্য প্রমাণসহ। সারা পৃথিবীর কাছে সু চির ইমেজে ধস নেমেছে। নিন্দার ঝড় উঠেছে। শান্তির নোবেল নিয়ে বড় রকমের প্রশ্ন উঠেছে। ইমেজ হারিয়ে সু চি ভয়াবহ চাপে পড়েছে।
সারা পৃথিবী যে ভাষায় কথা বলছে, বাংলাদেশেরও সেই ভাষায়ই কথা বলাটা প্রত্যাশিত। বাংলাদেশের স্বার্থেই সেভাবে কথা বলা দরকার। তাতে সু চির উপর চাপ আরও বাড়বে। তা না করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সু চিকে ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে, ‘সংবেদনশীল’ মানুষ হিসেবে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন!
বারো থেকে চৌদ্দ লাখ রোহিঙ্গার চাপ কাঁধে নিয়ে সু চির ভাবমূর্তি উন্নয়নের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ? সবচেয়ে অবুঝও নাকি নিজের স্বার্থ বোঝে, বাংলাদেশ কী ‘অবুঝ’র চেয়েও বেশি কিছু? যে নিজের স্বার্থ বোঝে না!
গ. ‘আরসা’র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী’- এই বক্তব্য মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই বক্তব্য সমর্থন করে আবারও কথা বললেন। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দাবি এবং ‘আরসা’র স্বীকারোক্তি ছাড়া তৃতীয় কোনও সূত্র এই প্রমাণ পায়নি যে ২৪ আগস্ট ‘আরসা’ আক্রমণ করেছিল। উল্টো অ্যামনোস্টিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই প্রমাণ তথ্যসহ হাজির করেছে যে, ২৪ আগস্টের আগে থেকেই মিয়ানমার সামরিক বাহিনী গণহত্যার প্রস্তুতি নিয়েছিল। রাখাইনে সৈন্য সমাবেশ করেছিল। কারও অনুসন্ধানেই ‘আরসা’র আক্রমণের তথ্য মেলেনি।
বিদেশে অবস্থানরত ‘আরসা’ নেতারা কার স্বার্থ দেখছে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর না রোহিঙ্গাদের সেই প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে সামনে চলে এসেছে। ‘আরসা’র আক্রমণ বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে কোনও তথ্য-প্রমাণ না থাকলেও, শুধুমাত্র মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দাবির উপর ভিত্তি করে, ‘যৌথ অভিযান’র ভুল প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এখনও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ভাষাকে সমর্থন করেই কথা বলছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
০২.
‘পাশে’ শব্দটির অর্থ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বদলে দিয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে রাশিয়া-চীন নাকি বাংলাদেশের ‘পাশে’ আছে! রাশিয়া-চীন স্বীকারই করে না যে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ‘গণহত্যা’ সংগঠিত করছে। ‘এথনিক ক্লিনজিং’ করছে তাও স্বীকার করে না। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর যে ভাষ্য ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান’ চীন-রাশিয়ার ভাষ্যও তাই। নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যায়, এমন প্রস্তাবে একবার ভেটো দিয়েছে চীন-রাশিয়া।
ইউরোপের উদ্যোগে নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ আলোচনায় রাশিয়া-চীনের কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জোরালো প্রস্তাব আনা যায়নি। যে আলোচনা থেকে শুধু রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে, সেখানেও কঠোর নিন্দা প্রস্তাব আনা যায়নি চীন-রাশিয়ার বিরোধিতার কারণে। নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল যে ইউরোপ, তারা ১৮ অক্টোবরও বলেছে চীন-রাশিয়ার কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনতে পারেনি।
এখন রাশিয়া মৃদু স্বরে ‘কফি আনান’র রিপোর্ট বাস্তবায়ন করার কথা বলেছে। চীন সংকটের গভীরে যেতে বলেছে। আর এতেই নাকি প্রমাণ হচ্ছে চীন-রাশিয়া বাংলাদেশের ‘পাশে’ আছে!
এই আমাদের কূটনীতি, এই আমাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ!
০৩.
বাংলাদেশের হয়েছেটা কী? সু চির ইমেজ ধস ঠেকানোর দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ, চীন-রাশিয়া নিজেরা নিজেদের সাফাই গাইছে না, বাংলাদেশ তাদের হয়ে সাফাই গাইছে। কারণটা কী, রহস্য কোথায়?
গোলাম মোর্তোজা: সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
[email protected]




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close