সোমবার ১১ ডিসেম্বর ২০১৭


যে কোন তিমির আক্রমণ ঠেকাতে…


সংবাদ সমগ্র - 12.10.2017

লীনা পারভীন: বলছিলাম হালের আলোচিত গেম ব্লু হোয়েল সম্পর্কে। এই ইন্টারনেটের যুগে এখন সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টনের মত গোটা দুনিয়া হাতের মুঠোয়। এই মুঠো প্রসারিত আছে বাচ্চা থেকে বুড়ো সবার মাঝে। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফলের পাশাপাশি ব্লু হোয়েলের মত কিছু কুফল সম্পন্ন উপাদানও ঢুকে পড়ছে আমাদের নাগরিক জীবনে।

এই ব্লু হোয়েল গেমটির কথা প্রথম আমি শুনেছি আমার দুই ছেলের কাছে। ওরা দুজনেই ক্লাস নাইনে পড়ে। আমি একজন কর্মজীবি মা। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই আমরা কাজের সূত্রে বাইরে থাকি দিনের গোটা সময়। এর মাঝে বাচ্চারা স্কুলে যায় বা বাসায় থাকে। স্বাভাবিকভাবেই জীবনের বাস্তব প্রয়োজনে তাদের হাতে দিতে হয়েছে মোবাইল। খোঁজ খবর রাখার এটাই এখন একমাত্র উপায়।
ডিজিটাল যুগের সন্তানেরা আর এনালগ মোবাইলে খুশী হয় না। দিতে হয় স্মার্ট ফোন। বাসায় থাকে ওয়াইফাই বা ইন্টারনেট সুবিধা। সেই সুবাদে আমার ছেলেরাও গেমের দুনিয়ায় বিচরণ করে। তাদের কাছেই একদিন গল্প শুনলাম এমন একটি মরণঘাতি গেমের।
বিস্তারিত শুনতে গিয়ে আমার গা শিউরে উঠেছিলো। মোট ৫০টি স্তরের শেষ স্তর আত্মহত্যা করা। কী ভয়ঙ্কর কথা? একজন মডারেটরের সহায়তায় সারাক্ষণ ছায়ার মত লেগে থাকে এই গেমের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শুনেছি কতটা নেশাযুক্ত করে ফেলে এই গেম খেলোয়াড়দের।
কথামত না শুনলে পিতামাতাকে হত্যা করবে বলেও হুমকী দেয়া হয় যেখানে একজন দুর্বল নার্ভের মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজের মধ্যে অস্থিরতা বোধ করে। প্রথমে বিশ্বাস করিনি ওদের কথা। ভেবেছিলাম এসব আবার হয় নাকি? কথা বলতে বলতে দেখলাম আমার ছেলেরা অনেক তথ্যই জানে এর সম্পর্কে।
বলে রাখা ভালো যে এখনকার বাচ্চারা তাদের অভিভাবকের চেয়ে অনেক বেশী অগ্রসর থাকে। ইন্টারনেটের সহায়তায় তারা দুনিয়ার অনেক কিছুই আগেভাগে জেনে যায় বা জানার আগ্রহ জন্মে ওদের মাঝে। স্কুল, কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের মাঝে আলাপচারিতায় উঠে আসে কে কতটা তথ্যসমৃদ্ধ।
তাই অনেক অভিভাবক চাইলেও তার সন্তানদের বিচরণক্ষেত্র সম্পর্কে আইডিয়াও করতে পারেন না। বা আইডিয়া করতে পারলেও কেমন করে আটকাবে বা সত্যি তারা কোথায় কোথায় বিচরণ করছে সেটাও অনেক সময় বুঝতে পারেন না।
বলছিলাম ব্লু হোয়েল গেমের কথা। বাচ্চাদের কাছ থেকে যখন প্রায় পাঁচ ছয়মাস আগে শুনেছিলাম কেবল বাচ্চাদের বলে রেখেছিলাম যেন কখনই কোনভাবেই সেইসব জায়গায় ঘুরাফিরা না করে। ওদের বন্ধুরা খেলে কি না সেটাও জেনে নিয়েছিলাম। জানলাম বাংলাদেশে এটি প্রচলিত নয় তাই ভয়ের কিছু নাই। সময়ে সময়ে খেয়ালও করেছি তারা কোন গেম খেলছে বা কোনভাবে আমাদের পারিবারিক আবহাওয়া থেকে দূরে সরে যায় কি না।
যেহেতু বাংলাদেশে কোন আলোচনা ছিলো না তাই ভেবেছিলাম বিদেশী গেম হয়তো আমাদের দেশে এখনও এটা সেভাবে পরিচিত নয়। প্রথম এটি আলোচনায় এলো রাজধানীতে হলিক্রস কলেজের একজন ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পরিবর্তন ডট কম সহ আরও কিছু সংবাদ মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ হিসাবে বলা হয়েছে মেয়েটির বাবা মা ধারণা করছেন হয়তো মেয়েটি এই গেমে আসক্ত ছিলো।
যদিও পরবর্তীতে বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি। শুরু হয় তুমুল আলোচনা, সমালোচনা। পত্রিকায় লেখালেখি, টক শো, ব্যক্তিগত আলাপচারিতা। অনেকেই বলছেন এটা নিয়ে যত আলোচনা হবে ততই ছেলেমেয়েরা জানতে পারবে আর সেটাই হয়তো ওদেরকে আগ্রহী করে তুলবে। বিষয়টা কী আসলেই তাই? আমাদের বাচ্চারা কী আগেই আগ্রহী নয়? কতটা নিশ্চিত আমরা?
আর আলোচনা না করলেই কী বিষয়টাকে লুকানো যাবে? একটু সচেতনভাবে খোঁজ নিলেই পাওয়া যাবে আমাদের সন্তানেরা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। বিশ্ব সম্পর্কে তারা আমাদের চেয়ে বেশী খবর রাখে। গেম কী কেবল বাচ্চারাই খেলে? না। অনেক বয়স্ক লোকেরাও গেমে আসক্ত থাকে। ইন্টারনেট ব্যবহারের আজকাল অনেক রাস্তা খোলা আছে।
আমি যখন আমার সন্তানকে জিজ্ঞেস করলাম তোমরা গেম সম্পর্কে এত কথা কোথায় জেনেছো? এমনকি যে মেয়েটি মারা গেলো তারা সম্পর্কেও তারা আপডেটেড। ওরা পত্রিকা খুব একটা পড়ে না। টিভিও আজকাল দেখে না। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতি থেকে শুরু করে সমসাময়িক সকল নিউজ সম্পর্কে যেমন আপডেটেড থাকে তেমনি নিজস্ব বিশ্লেষণও দাঁড় করায়। কেমন করে জানলো তারা?
জানলাম ইউসি ব্রাউজারে সব কিছুর এলার্ট আসে। ব্লু হোয়েল নিয়ে আলোচনায় ওরাই আমাকে জানালো যে এটা নর্মাল কোন ব্রাউজারে ঢুকা যায় না। তার জন্য স্পেশাল কিছু লিঙ্ক দেয়া থাকে যেটা সাধারণত হ্যাকাররা ব্যবহার করে থাকে।
টিভিতে নিউজে দেখলাম স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারাও এই গেম সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা রাখছে। তারাও বন্ধুদের আলাপে, কোন আত্মীয়ের কাছে গল্প শুনেছে। এর মানে এটি আমাদের গণমাধ্যমেই এসেছে অনেক পরে। আমাদের সন্তানেরা অনেক আগেই জেনে বসে আছে।
ছেলেদেরকে জিজ্ঞেস করলাম এর থেকে প্রতিকার কী? সময় নষ্ট না করেই উত্তর দিলো পুলিশকে অনেক বেশী সচেতন হতে হবে কিউরেটরদের ব্যাপারে। কিউরেটর কারা? জানলাম বাংলাদেশে যদি এই গেমটি প্রচলিত থাকে তাহলে বাংলাদেশী কিছু এজেন্ট তৈরী করবে যারা গেমটাকে পরিচালিত করবে। অর্থাৎ আমাদের দেশীয় লোকেরাই লোকাল এজেন্ট হিসাবে নিয়োজিত আছে হয়তো।
পুলিশকে খুঁজতে হবে এসব কিউরেটর হিসাবে কেউ কাজ করছে কি না? থাকলে কোথায় তাদের বসবাস। কোন মাধ্যম ব্যবহার করে বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করছে এই মরণখেলাকে? গেমের বিস্তার ঘটেনি বলে আরাম করে বসে থাকাটা মনে হয় উচিত হবে না। এ সম্পর্কে যেমন নিশ্চিত হতে হবে ঠিক তেমনি ভবিষ্যতেও যেন বিস্তার না হয় সেটার ব্যবস্থা নিতে হবে।
বলে রাখা ভালো আমার এই লেখাটি লিখতে পুরোটাই সাহায্য করেছে আমার দুই সন্তান। ওদেরকে যুক্ত করার একটাই উদ্দেশ্য ছিলো। তারা আমাকে শেখানোর মাধ্যমে নিজেরা শিখবে এবং অভিভাবক ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যে পরামর্শ দিলো সেটার ব্যাপারে ওদের যেমন এক ধরণের জবাবদিহি জন্মাবে ঠিক তেমনি আমার জন্যও রাস্তা খুলে গেলো ওদের বিষয়ে নজরদারি করার।
আমি প্রায়শই এই কাজটি করি। বিভিন্ন ইস্যু বিশেষ করে কোন সম সাময়িক বিষয়ে লিখতে গেলে আগে ওদের মতামত নেই, বিশ্লেষণ জানি।
পাশাপাশি অভিভাবকদেরকেও খেয়াল রাখতে হবে আপনার সন্তানের হাতে যে মোবাইল বা ট্যাব আপনি দিয়েছেন সে তার ব্যবহার কেমন করে করছে? কোথায় কোথায় ভ্রমণ করছে ইন্টারনেটের দুনিয়ায়। কোন কোন গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সন্তানকে বিচ্ছিন্ন রাখা যাবে না।
বাবা মা ব্যস্ত থাকে তবে যেটুকু সময় পাওয়া যায় সেটা যেন বিনিয়োগ করা হয় সন্তানের জন্য। তাদের সাথে তাদের রুচি, পছন্দ, রাগ, অভিমান ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে হবে খোলামেলা। নিজেদের ইচ্ছাকে জোর করে চাপিয়ে দিলে সেটার ফলাফল হয় উল্টো। বরং তাদের ইচ্ছাটাকেই প্রাধান্য দিয়ে কোথায় কোথায় তাদের চিন্তার ত্রুটি আছে সেটাকেও আলোচনায় এনে বুঝিয়ে দিতে হবে।
সন্তানের পছন্দের সাথে নিজেদের চাওয়ার একটা সঠিক মিলন করতে হবে। যতটা কঠিন হওয়া দরকার ঠিক ততটাই কঠোর নিয়ম আরোপ করাটাও জরুরি। অযথা নিজের ছোটবেলাকে টেনে এনে আপনার বাবা মা কেমন করে আপনাকে মানুষ করেছে সেসব উদাহরণ দেয়াটা বোকামো। কারণ আমাদের কাল আর আমাদের সন্তানদের কাল এক নয়। আমাদের সময় এত হাতছানি ছিলো না।
এত পছন্দ অপছন্দের তারতম্য ছিলো না। বাবা মা যখন যেভাবে যা বলেছেন তাই মাথা নীচু করে মেনে নিয়েছি কিন্তু এখনকার আধুনিক যুগের বাচ্চাদের নিজস্ব একটা মতামত চলে আসে অনেক আগে থেকেই। তাদের চাহিদার তালিকায় যুক্ত হয় নতুন নতুন বিষয়। তবে এটাও মাথায় রাখা জরুরী যে কোনটা গুজব আর কোনটা সত্য ঘটনা।
কোন কিছুকেই এক বাক্যে উড়িয়ে দেয়াটা যেমন বোকামো ঠিক তেমনি অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে গিয়ে অযৌক্তিক ভয় বা আক্রান্ত হয়ে যাওয়াটাও সঠিক নয়। বাচ্চাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মত সক্ষমতা অর্জনে অভিভাবকদের ভুমিকাই সবচেয়ে বেশী। সন্তানের মধ্যে কোন পরিবর্তন এলে সেটা কেন এসেছে এটাও সতর্কতার সাথে নিতে হবে। বিশেষ করে টিন এজ বাচ্চাদের ব্যপারে সচেতনতা একটু বেশী প্রয়োগ করতে হবে।
আমি আশাবাদী যে আমাদের দেশে যে কোন বিষয় নিয়ে আজকাল অনেক বেশী আলোচনা চলে। ফেসবুকের ভূমিকা আর কোন দেশে এতটা কার্যকর কি না আমি জানি না। অতিরিক্ত হলেও যে আলোচনা চলছে সেটা আখেরে খারাপের চেয়ে ভালোই নিয়ে আসবে। ইতিমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তবে আইন শৃঙ্ক্ষলা বাহিনীকে অবশ্যই আরও অনেক বেশী সতর্ক হতে হবে যাতে করে ইন্টারনেটের সুযোগ নিয়ে কেউ আমাদের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত না করতে পারে। ইন্টারনেটের অপরিচিত কোন গলি আছে কি না তা খুঁজে বের করতে হবে। আমরা নিশ্চয়ই উত্তরার সেই বাচ্চাটির হত্যার কাহিনী ভুলে যাইনি। এক একটি ঘটনা ঘটলেই কেবল আমরা সচেতন হবো এমন যেন না হয়।
তথ্য প্রযুক্তির এই অবাধ প্রবাহের যুগে যেমন কাউকে আটকে রাখা যাবে না কিন্তু আশা করছি আমাদের দেশের এই সেক্টরটির সাথে যারা যুক্ত আছেন সেসব প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনী এবং সরকারকেও হতে হবে অনেক বেশী অ্যাডভান্স এবং তথ্য জ্ঞান সম্পন্ন। যেসব গেম আসছে সেগুলোর সামাজিক ও মনোজাগতিক প্রভাব বিচার করেই অনুমতি দেবার পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হবে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে।
ব্লু হোয়েল না হোক অন্য নামে অন্য কোন কিছুই যেন আমাদেরকে, আমাদের তরুণ প্রজন্মকে হুমকী দিতে না পারে।
লীনা পারভীন: কলাম লেখক ও সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close