সোমবার ১১ ডিসেম্বর ২০১৭


ভাবতে হবে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিরক্ষা নিয়ে


সংবাদ সমগ্র - 14.09.2017

জাকির তালুকদার : রোহিঙ্গাকাণ্ড এবং মিয়ানমারের আগ্রাসী আচরণ একেবারে নগ্ন করে দিয়েছে আমাদের সরকারের অসহায়তা। অসহায় আমরা সমাধান কামনায় একবার দৌড়াচ্ছি ভারতের কাছে, একবার যাচ্ছি চীনের কাছে। এবং বিস্ফোরিত অবিশ্বাস নিয়ে দেখছি, যে ভারতকে আমরা আমাদের সবচাইতে কাছের বন্ধু বলে জানি, সেই ভারত কথা বলছে হুবহু মিয়ানমারের অং সান সুচির সুরে সুর মিলিয়ে। অবিশ্বাস্যই বটে!


ভারতকে কী দিইনি আমরা! বিশাল করিডর দিয়েছি, দেশের সিংহভাগ ব্যবসা তুলে দিয়েছি তাদের হাতে, ভারতীয়-বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সব ঘাঁটি উচ্ছেদ করেছি, তাদের নেতাদের তুলে দিয়েছি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে, আন্তর্জাতিক সব ইস্যুতে অব্যাহত সমর্থন করে গেছি ভারতকে। সেই ভারতের এমন আচরণ অবিশ্বাস্য মনে হতেই পারে। কিন্তু সেটাই বাস্তব। ভারত তার নিজের স্বার্থ আগে দেখবে। মিয়ানমার নিয়ে চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত ভারত। মিয়ানমারের চীনমুখিনতা কাটিয়ে তাদেরকে ভারতমুখি করার আপ্রাণ চেষ্টা মোদির। কাজেই বাংলাদেশের সমস্যা সমাধান করার চাইতে মিয়ানমারের সুচি-জান্তাকে খুশি রাখা এখন তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আর চীন। মিয়ানমারের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বহু বছর ধরে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক যতই থাকুক, চীন জানে যে বাংলাদেশ প্রধানত ভারতমুখি। অনেক ব্যবসা এবং ঠিকাদারি চীনকে দিয়েছে বটে বাংলাদেশ, তবে ভারতের অনিচ্ছাকে মূল্য দিয়ে সোনাদিয়াতে চীনকে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করতে দেয়নি। নৌ-বাণিজ্যে চীনের বিশাল স্বপ্ন একটু চোট খেয়েছে তাতে। তবে ভারতের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যে চীনের তুলনায় ভারতের দিকে বেশি হেলে আছে, সেটা চীন ভালোই বোঝে। কাজেই পরীক্ষিত এবং করতলগত মিয়ানমারকে দূরে ঠেলে বাংলাদেশকে সমর্থন দেবে না চীন।

এই দুই দেশ ছাড়াও আরাকানে খেলতে নেমেছে অনেক খেলোয়াড়। বহুজাতিক কোম্পানি, তুরস্ক ও পাকিস্তান, তাদের মদদে প্রতিষ্ঠিত মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠী। লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা বাংলাদেশের মাথায় তুলে দিচ্ছে মিয়ানমার। অন্যেরা সমর্থন জানাচ্ছে মিয়ানমারকে, অথবা তাকিয়ে তাকিয়ে মজা দেখছে।

আর মিয়ানমার বাংলাদেশকে বিন্দুমাত্র পরোয়াই করছে না। একটা কারণ হচ্ছে সে বোঝে যে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বড় শক্তিগুলো তাকে ঘাঁটাবে না। দ্বিতীয়, এবং আমাদের জন্য সবচাইতে লজ্জাজনক কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের সামরিক শক্তিকে তারা আদৌ আমলে নিচ্ছে না। তারা যদি জানত যে বাংলাদেশ তাদের রুখে দেবার সামর্থ রাখে, তাহলে নিঃসন্দেহে এই ধরনের আচরণ করার সাহস পেত না।

সবমিলিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে যে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে ভবিষ্যতে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এইসব প্রেক্ষিত বিবেচনা করে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নিজস্ব প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা বাংলাদেশকেই করতে হবে।

দুই. আমি কি সশস্ত্রবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলছি? বলছি। তবে সেই সঙ্গে এই কথাও বলছি যে শুধুমাত্র নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ভরসা করে বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে নিজেদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা সম্ভব নয়। তাছাড়া অস্ত্র প্রতিযোগিতায় এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের ভারটি বাংলাদেশ বহন করতে পারবে না। বিশাল সশস্ত্রবাহিনী পোষাও সম্ভব না দরিদ্র এই দেশের পক্ষে। তাহলে কীভাবে শক্তিশালী হবে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা? কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে আমাদের সার্বভৌমত্ব? উত্তর, জনগণের সামরিক শক্তি কাজে লাগানোর মাধ্যমে।

তিন. গণমিলিশিয়া গঠন করতে হবে। প্রতিটি সক্ষম নারী-পুরুষকে ন্যূনতম সামরিক শিক্ষায় পারদর্শী করে তুলতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে সবার জন্য সামরিক শিক্ষার ব্যবস্থা করলে জঙ্গি এবং সন্ত্রাসীদের প্রকোপ বাড়বে কি না? উত্তরটা হচ্ছে, না। কারণ নিজেদের সামরিক ট্রেনিং নেবার ব্যবস্থা জঙ্গি এবং সন্ত্রাসীদের নিজেদেরই আছে। তারা প্রতিনিয়ত সেই ট্রেনিং পাচ্ছে। এবং সেই শিক্ষার প্রয়োগ ঘটাচ্ছে। সবার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে বরং শান্তিপ্রিয় মানুষরা জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিজেদের আত্মরক্ষার ব্যবস্থাটাও করতে পারবেন। জনগণের সক্ষম অংশের সবার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণের ন্যূনতম ব্যবস্থার প্রস্তাব আমাদের।

দ্বিতীয় প্রস্তাব হচ্ছে উৎসাহী, দেশপ্রেমিক এবং অধিকতর যোগ্য যুবক-যুবতীদের আরও উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। নিয়মিত সশস্ত্রবাহিনীর মতোই। তারা ট্রেনিংটা একবার নিয়েই ক্ষান্ত হবে না। তাদের প্রতিবছর রিফ্রেশার ট্রেনিং-এরও ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে, যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে একদিনের মধ্যেই তাদের নিয়মিত বাহিনীর পাশে দাঁড় করানো সম্ভব হয়। কিউবাতে এই স্ট্রাটেজি সাফল্যের সঙ্গে কাজে লাগানো হয়। ইসরাইলেও। কিউবার এই ধরনের মিলিটারি-সমতুল্য ট্রেনিংপ্রাপ্ত নাগরিকের সংখ্যা সম্ভবত ২০ লক্ষ। আমাদের দেশে এই সংখ্যা অবশ্যই ৫০ লক্ষ হতে পারে।

এই গণপ্রতিরক্ষাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার সাহস কেউ পাবে না। কেউ সাহস পাবে না, এই দেশের জনগণ এবং সরকারের সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করার।

লেখক : কথাসাহিত্যিক




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close