সোমবার ১১ ডিসেম্বর ২০১৭


হায়দ্রাবাদের কান্না ও আমাদের শিক্ষা


সংবাদ সমগ্র - 29.08.2017

জিয়াউল হক : হায়দ্রাবাদ, দক্ষিণ ভারতের এক অন্যতম নগরী, কসমোপলিটন নগরী। প্রায় দুই শত বৎসর শাসন করে ইংরেজরা যখন উপমহাদেশ থেকে পাতাতাড়ি গুটিয়ে চলে যায় এ ভুখন্ডকে পাকিস্থান, ভারত, বার্মা, শ্রীলংকা এরকম এক একটা দেশে বিভক্ত করে রেখে, তখনও এই হায়দ্রাবাদ তার স্বাধীনতা রক্ষা করে রেখেছিলো কোনো মতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ইংরেজদের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ উস্কানিতে, উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদী হিংস্রতায় ভারত একতরফাভাবে আগ্রাসন চালিয়ে এ জনপদকে নিজের পেটে গিলে ফেলে ১৯৪৮ সালে। হায়দ্রাবাদ তার স্বাধীনতা হারায়।


যে রাজ্যটিকে মারাঠারা বার বার আক্রমণ করেও বশ্যতা শিকার করাতে পারেনি, যে রাজ্যটিকে মোগল স¤্রাট শাহজাহান থেকে শুরু করে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত গিলতে পারে নি, সেই সুদুর পর্তূগাল ও স্পেন থেকে পর্তূগীজ ও ফ্রান্স থেকে ফরাসী সৈন্যরা বছরের পর বছর চেষ্টা করেও অধীনতা স্বীকার করাতে পারে নি, এমনকি, যে জনপদকে পদানত করতে স্বয়ং নেপোলিয়ান বোনাপোর্টও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, মহিশুরের টিপু সুলতানকে মিশরে বসেই চিঠি লিখে আশ^স্থও করেছিলেন এই বলে যে, তিনি মিশরের ঝামেলা শেষে করেই ভারতের দিকে মনোযোগ দেবেন, টিপু যেন তার কথায় আস্থা রাখেন(সুত্র: White Mughals William Dalrymple, pp 101)
সেই জনপদকেই ভারত পদানত করে সহজেই! কিন্তু কি ভাবে? এ প্রশ্নের উত্তরটার মধ্যেই রয়েছে আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর।
একটা সময় পর্যন্ত শত শত লোভাতুর দৃষ্টির পরেও হায়দ্রাবাদ নিজের স্বাধীন সত্তা টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। মোগল সাম্রাজ্যের বাইরে ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী রাজ্য, সবচেয়ে ধনাঢ্য, পাহাড় নদী আর সবুজ বনের সমারোহে অপরুপ এ জনপদ যে কোনো আগন্তুকের দৃষ্টি কেড়ে নেবে প্রথম দর্শনেই।
মোসি নদীর তীর ঘেঁষে সেই ১৫৯১ সালে সুলতান কুলি কুতুব শাহ এ নগরীর ভিত্তি গাড়েন। গোলকুন্ডার বিখ্যাত হীরার খনি থেকে হীরা আহরণ ও আর তাকে ঘিরে গড়ে উঠা হীরা ব্যবসার উপরে নিজের বা নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাটাই বোধকরি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।
এর কারণও ছিল অবশ্য। আধুনিক বিশ্বে দক্ষিণ ও পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশে হীরার খনি আবিস্কারের পূর্বে এই হায়দ্রাবাদেই ছিল বিশ্বের একমাত্র হীরা খনি! সারা বিশ্ব থেকে হীরা, রত্ন ব্যবসায়ীরা সারা বৎসর হায়দ্রাবাদের অলি গলিতে ঘুর ঘুর করতো।
বাড়ির পাশে মোগল সম্রাট, পর্বতমালার ওপারের চীন থেকে শুরু করে সেই ইউরোপের রোম কিংবা প্যারিস অথবা প্রাক ভিক্টোরিয়া যুগের ইংল্যন্ড, হল্যান্ড সবারই নজর ছিল গোলকুন্ডার উপরে। এ সব স্থানের বড় বড় ব্যবসায়ী বা রাজা-রাজড়ার এজেন্টরা সারা বৎসর চষে বেড়াতো এ জনপদ কেবলমাত্র মহামূল্যবান এ পাথরের একটি মাত্র টুকরো হস্তগত করার জন্য! (সুত্র- White Mughals William Dalrymple, pp 111)
মোগল সম্রাটের কোহিনুর মুকুটের কথা আমরা জানি, এ মুকুটটি আজ ইংল্যন্ডের রাণীর মাথায় শোভা পাচ্ছে। এই মুকুটটিতে প্রায় দুই শত মহামুল্যবান হীরা-চুন্নি-মুক্তা’সহ বিভিন্ন নামী দামী পাথর থাকলেও তার নাম কোহিনুর হয়েছে একটিমাত্র কারণে, তা হলো, এসব মহামূল্যবান রত্নের মধ্যে সবচেয়ে দামী ও দুষ্প্রাপ্য যে হীরাকখন্ডটি রয়েছে, তার নামও কোহিনুর। বিশ্বের সবচেয়ে নামী, সবচেয়ে দামী হীরক খন্ডের নামেই নামকরণ করা হয়েছে মুকুটটির। বলাই বাহুল্য, এই কোহিনুরটিও পাওয়া গেছে এই গোলকুন্ডাতেই।
এ বাস্তবতা সুলতান ক্বুুলি কুতুব শাহ খুব ভালো করেই জানতেন। ভারতের দক্ষিণ উপকূল জুড়ে হাজার হাজার পর্তূগীজদের নজর রয়েছে এর উপর, নজর রয়েছে মারাঠা, এমনকি, মহিশুরের টিপু’রও। এ ছাড়াও দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলের সাথে মোগলদের সংযোগ পথেই গোলকুন্ডার অবস্থান। অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছাড়াও সামরিক এবং বাণিজ্যিক, উভয় বিচারেই এ অঞ্চলের গুরুত্ব সীমাহীন!
কাজেই সুলতান এ অঞ্চলে নিজের নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ী করতেই গোলকুন্ডার পাশে মুসী নদীর তীর ঘেঁসে একটি নগর স্থাপনের পরিকল্পনা করলেন। ভাবনার সাথে সাথে দেরি না করে কাজও শুরু করলেন। সেটা সেই ১৫৯১ সালের ঘটনা।
সুলতান ক্বুলি কুতুব শাহ ছিলেন শিয়া ধর্মাবলম্বী। তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল ইস্পাহানে ‘সাফাউই’ ( ‘সাফাবি’ বা ‘সাফাভি’ হিসেবেও পরিচিত) সম্রাটের সঙ্গে। কট্টর সাফাভি শিয়াজিমের অনেক শিক্ষা, অনেক দর্শনই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা তাওহিদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তা ছাড়া, প্রিয় রাসুল সা: এর সম্মানিত সাহাবীদের কারো কারো প্রতি এদের বৈরিতা সকল ভব্যতা ও সাধারণ ভদ্রতারও সীমা লংঘন করে। অত্যন্ত নিষ্ঠাবান মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দৃষ্টিতে সংগত কারণেই তারা ইসলামের গন্ডীতে পড়ে না।
তা ছাড়া ভারতীয় সম্রাজ্যের হয়েও, মোগল সীমান্তে বসবাস করেও সাগরপারের ইস্পাহানের সাথে রাজনৈতিক, আদর্শিক, মনস্তাত্বিক ও বাণিজ্যিক ঘনিষ্ঠতা সঙ্গত কারণেই কেবল আওরঙ্গজেব নয়, কোনো মোগল সম্রাটেরই সহ্য হবার কথা নয়। তা ছাড়াও সুলতান পারস্যের ইস্পাহান সহ অন্যান্য বিভিন্ন শহর থেকে ভাগ্যের সন্ধানে আসা ইরানি সাফাভি শিয়া মতাদর্শী অনেক কবি-সাহিত্যিক, সৈনিক, শিল্পী, লেখক, বুদ্ধিজীবি, পন্ডিত এবং আলেম-ওলামাকে পুরো শহরজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন।
এভাবে অনেকটা অলিখিতভাবেই ইরানের বাইরে পুরো হায়দ্রাবাদ জুড়ে শিয়া মতাদর্শ এ রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ে। এ বাস্তবতাও আশে পাশের রাজ্যের শাসক ও অধিবাসীদের নজর এড়ায়নি, তারা বিষয়টাকে খুব একাট ভালো চোখে দেখেনি। কাজেই মোগল সম্রারাজ্যের সাথে গোলকুন্ডার নিয়ন্ত্রণের অধিকারী ক্বুলী কুতুব শাহ’র বিরোধে অবাক হবার কোনো কারণ নেই।
এতসব বাস্তবতাকে মাথায় রেখে সুলতান তার পরিকল্পনা দ্রত বাস্তবায়ন করতে মাঠে নামলেন। গড়ে তুলতে লাগলেন একটি নতুন নগরী। শিয়া দর্শনের মুল কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামের চতুর্থ খলীফা, প্রিয় রাসুল সা: এর জামাতা, হযরত আলী রা: এর অস্তিত্ব। এ মহামানবকে ঘিরেই তাঁর শাহাদাতের পরে মুসলমানদের একটা বিভ্রান্ত গোষ্ঠী শিয়া মতবাদের উদ্ভব ও বিস্তার ঘটায়। হযরত আলি রা: সাধারণত আলি ইবনে আবি তালেব নামেই পরিচিত। কিন্তু এর বাইরে তাঁর আরও একটি নাম প্রচলিত আছে জানি, অনেকেই তাকে ‘হায়দার’ বলে ডাকেন।
অত্যন্ত নিষ্ঠাবান শিয়া মুসলমান সুলতান ক্বুলি কুতুব শাহ নতুন যে নগরীর গোড়াপত্তন করলেন, সেই শহরের নামও রাখলেন এই আলী হায়দার, নামের শেষাংশ; ‘হায়দার’ শব্দটির সাথে মিলিয়ে ‘হায়দ্রাবাদ’। যেখানে ‘হায়দার’ আবাদ হবে, যে সমাজ, যে নগর হযরত আলীর মত শত শত ‘আলী হায়দার’ জন্ম দেবে!
জনবল,শ্রম ও লোকবল আর সম্পদের যখন কোনো অভাব নেই, তখন তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে খুব বেশি বেগ পেতে হয় নি। তিনি তার নতুন শহর হায়দ্রাবাদকে সাঁজালেন মনের মত করে, নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে!
এর মাত্র ষাটটি বৎসর পরে ১৬৫০ খৃষ্টাব্দে ফরাসী পর্যটক M de. Thevenot যখন নতুন এ নগরী পরিভ্রমণ করেন, তিনি তার জবানীতে একে ‘Country of Diamond’ ‘হীরার দেশ’ বা ‘হীরানগর’ বলে অভিহিত করেছেন।
উপকুলীয় বন্দর মুসালিপট্টম-এ নিয়োজিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অফিসার, জেনারেল William Methwold’ও এর কিছুকাল পরে গোলকুন্ডা তথা নতুন এ নগর; হায়দ্রাবাদ সফর করেন। নগরীর প্রাচুযর্, ঐশ্বর্য আর সৌন্দর্য দেখে অভিভুত হয়ে এক চিঠিতে কোম্পানীর হেড অফিস মাদ্রাজে তার উর্ধতন কর্মকর্তাকে যা লেখেন, তার সরল বাংলা দাাঁড়ায়;
এই শহরের নির্মল বাতাস, সুমিষ্ঠ পানি, উর্বর মাটির কথা না হয় বাদই দিলাম, সুলতানের প্রাসাদের কথা বলি, মর্মর পাথরে গড়া, সোনায় মোড়ানো এ প্রাসাদের উপমা পুরো মোগল সা¤্রাজ্যে আর দ্বিতীয়টি নেই! এর প্রতিটি খূটি নাটি, এমনকি, দরজা-জানালার চৌকাঠ পর্যন্ত সোনা দিয়ে মোড়ানো! এদের কোষাগারে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী রত্নগুলো মওজুদ রয়েছে। ভারতবর্ষের সবচেয়ে ধনী এ রাজ্যের সুলতান বিজাপুরের রাজকন্যাকে বিয়ে করেছেন, এ ছাড়াও সুলতানের আরও তিনজন স্ত্রী ও এক হাজার রক্ষিতা রয়েছে! (সুত্র: ঐ)
অন্য এক সুত্র থেকে জানা যায়, সুলতানের মনোরঞ্জনের জন্য সর্দসর্বদা প্রস্তুত রাখা হতো প্রায় কুড়ি হাজারের মত নর্তকী! এদের মধ্যে থেকেই পছন্দনীয়াদের ডেকে নিয়ে সুলতান প্রতি শুক্রবার নাচের বিশেষ আয়োজন করতেন।
নারীঙ্গির সাথে সারিঙ্গি, আর সুরের সাথে সুরারও ব্যবস্থা থাকতো।
শহরটি আয়তন, এর গুরুত্ব ও ঐশ্বর্য ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে যেমনি, তেমনি তা বার বার বহি:শত্রুর আক্রমণের শিকারও হয়েছে। সম্রাট আওরঙ্গজেব তো ১৬৮৭ খৃষ্টাব্দে শহরটিকে ধ্বংস করে ছাড়েন। কিন্তু তার পরেও মাত্র কয়েকটি দশকের মধ্যে হায়দ্রাবাদ আবার নিজের পা’এ উঠে দাঁড়িয়েছে। ফিরে পেয়েছে এর ঐশ্বর্য আর সুনাম। হয়ে উঠেছে আরবি, ফার্সি ও উর্দূ ভাষার এক লীলাভূমি! শত শত কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী, পন্ডিত ও বুদ্ধিজীবিরা চারিদিক থেকে এসে ভীড় করেছেন, বসতি গেড়েছেন এ শহরে। দেখতে দেখতে রাজ্যের জনসংখ্যা আড়াই লক্ষে পৌছে যায়। এদের মধ্যে পারসিক, আরব, চীনা, ফরাসি, ইংরেজ, পর্তূগীজসহ নানা দেশের লোকজন স্থানীয় নারীদের বিয়ে করে বসতি গেড়েছেন।
বাইরে থেকে ব্যবসা, ভ্রমণ বা অন্য কোনো কাজে এসে বসবাসকারীদের মধ্যে একজন সুদর্শন স্কটিশ ইংরেজ জেনারেলও ছিলেন। এই জেনারেল ও চৌদ্দ বসর বয়সী এক রাজকুমারীর মধ্যে গড়ে উঠা অসম প্রেম, সন্তান ধারন এবং এ ঘটনার পরবর্তি পরিস্থিতি হায়দ্রাবাদের রাজনীতিতে এক সুদুরপ্রসারী প্রভাব রেখে যায়! এ রাজ্যের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে চীরদিনের জন্য পরিবর্তিত করে দিয়ে যায় এই একটিমাত্র অসম ও করুণ প্রেমের ঘটনা। কিন্তু এ প্রেমের ঘটনা ঘটতে পেরেছিল যে সাংষ্কৃতিক ও নৈতিক আবহে, তার দিকে নজর না দেয়াটা হবে আত্মপ্রবঞ্চণা মাত্র!
সে ঘটনার প্রায় দেড় শত বৎসর পরে এসে ভারত কর্তৃক ১৯৪৮ খৃস্টাব্দে হায়দ্রাবাদকে সফলভাবে হজম করতে পারার পেছনে সেই পরিবর্তন একটা অন্যতম মুখ্য ভুমিকা পালন করেছে।
আমরা আজ যারা হায়দ্রবাদ হজমের পেছনে ভারতের ভূমিকার সমালোচনা করি, তাদের উচিৎ, সমালোচনার আগে ইতিহাসের প্রতিটি পরতে পরতে নিজেদের ব্যার্থতা, অমার্জনীয় গাফিলতি আর ত্রুটিগুলোকে চিহ্নিত করা, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের আদর্শ আর জীবনযাপন প্রণালী তথা সংস্কৃতিকে শুধরে নেয়া, তা না হলে হায়দ্রাবাদ হজম করার মত ঘটনা বার বার ঘটতেই থাকবে।




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close