রবিবার ২২ অক্টোবর ২০১৭


রোহিঙ্গাদের মর্মন্তুদ জীবন এবং সু চির ভূমিকা


সংবাদ সমগ্র - 29.08.2017

চিররঞ্জন সরকার : মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা বুঝি খুবই দুর্ভাগা জাতি। প্রতিনিয়িত দুঃখ-কষ্ট বঞ্চনা ভোগ করে কোনো রকমে ভাগ্যের জোরে বেঁচে আছি। কিন্তু যখন ফিলিস্তিনিদের দিকে তাকাই, তখন মনে হয়; না, ওদের তুলনায় আমরা অনেক ভালো আছি। মায়ানমারের আক্রান্ত মুসলমানদের কথা যখন ভাবি, তখনতো মনে আর কোনো খেদই থাকে না। উল্টো যন্ত্রণাটা আরও বাড়ে! একটি জনগোষ্ঠীর উপর এমন নির্মম নিপীড়ন দেখে, এমনকি বিভিন্ন দেশে অধিকার বঞ্চিত লড়াকু বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানুষদেরও তখন অনেক সৌভাগ্যবান মনে হয়!

মানবতাহীন মানব যেন এই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। তারা বেঁচে আছে পশুরও অধম হয়ে। প্রতি পদে অত্যাচার আর নির্যাতন। এ এক অকল্পনীয় জীবন, বেঁচে থাকা, অথবা নির্মমভাবে মরা। একদিকে নিজের দেশের মিলিটারি মারছে। আরেকদিকে রাইফেল তাক করে আছে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। ভেবে দেখুন, বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরে হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে নৌকা দিনের পর দিন ভেসে বেড়াচ্ছে, অথচ তীরে ঠেকতে পারছে না।
চোখের সামনে ওই ছবিটাকে রেখে দিন, কি ভাবে তারা দিনের পর দিন খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও পানীয় জলের অভাবে মাববেতর জীবন যাপন করছে। আমরা খালি কল্পনাই করতে পারি কিন্তু ভেবে কূল পাব না। এই কী মানব জন্ম?
মানুষের কথা না হয় বাদই দিলাম, উন্নত দেশের কুকুরেরাও তো রোহিঙ্গাদের চেয়ে ঢের বেশি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেঁচে আছে! তাহলে তারা পারছে না কেন? কে দায়ী? অদৃষ্ট? নাকি চতুর রাষ্ট্রব্যবস্থা? কোথায় মানবতার জন্য মায়াকান্না করা মানবাধিকারকর্মীগণ? কোথায় বিশ্ব বিবেক? কোথায় জাতিসংঘ?
গত কয়েকদিন ধরে মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে তুমুল লড়াই চলছে রোহিঙ্গা জঙ্গি ও সে দেশের সেনাবাহিনীর। ফলে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে শরণার্থীরা। এতে প্রবল চাপে পড়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে বেশ কয়েকবার টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। তবে সে চেষ্টা বিফল করে দেয় বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ‘বিজিবি’।
বৌদ্ধপ্রধান দেশ মায়ানমারে রয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ মুসলিম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গা মানুষ। তবে আজও তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি নেইপিদাও। মিলিটারি জুন্টার হাত থেকে দেশের আংশিক ক্ষমতা অং সান সু চি-র হাতে গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সু চি সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশকারী। তাদের জঙ্গি আন্দোলন মেনে নেওয়া হবে না।
সর্বশেষ গত শুক্রবার মায়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সংঘর্ষে ৮৯ জন নিহত হয়। তবে বেসরকারি সূত্রের মতে, হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। ‘দ্য আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি’ নামের জঙ্গি সংগঠনটি (এআরএসএ) এই হামলার দায় স্বীকার করে আরও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে।
আর এই অজুহাতে হিংস্র হয়ে উঠেছে মায়ানমারের সেনাবাহিনী। তারা শুরু করেছে নির্বিচারে রোহিঙ্গা নিধন। মুষ্টিমেয় কয়েকজন বিপথগামী অবিবেচকের জন্য আক্রান্ত হচ্ছে নিরীহ অসহায় মানুষ। ‘দ্য আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি’ নামের জঙ্গি সংগঠনের পেছেনে কায়েমী স্বার্থবাদী দেশগুলোর হাত আছে। আছে বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস। কিন্তু এর জন্য একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর উপর এভাবে নির্যাতন নেমে আসবে? এই কি সভ্যতা? এই কি মানুষের সমাজ?
মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের যেভাবে অমানবিক নিপীড়নের মাধ্যমে জাতিসত্তাগতভাবে নিশ্চিহ্ন (ethnic cleansing) করার প্রক্রিয়া চলছে, তাকে ‘গণহত্যা’ বললেও কম বলা হয়। সেখানে একাধারে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে কুপিয়ে-পিটিয়ে-পুড়িয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে, নারী-শিশুদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, তাদের ঘরবাড়ি-স্কুল-মসজিদ-দোকানপাট পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তাদের সম্পদ লুন্ঠন করা হচ্ছে, রোহিঙ্গা এলাকায় পরিকল্পিতভাবে খাদ্য-সঙ্কট সৃষ্টি করা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে জঙ্গলে বা নদীতে, না হয় প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে-যে বিষয়টাকে এক কথায় বলতে গেলে ‘মানবতা-বিরোধী অপরাধ’ বলতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সাং সু চির নীরবতা বিশ্ববিবেককে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে। গত দুই বছর ধরে কাগজে কলমে তার দলই সরকার চালাচ্ছে। অথচ, নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তিনি ক্ষমাহীন উদাসীনতা প্রদর্শন করছেন! তারা কি নিপীড়িত নন? তারা কি দেশের মানুষ নন? এই শেষ প্রশ্নটিই অমোঘ।
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নন, তারা বাঙালি, রিফিউজি-মনে করে এসেছে মিয়ানমারের সামরিক ও আধা-সামরিক সরকার, আর এখন মনে করছে সু চি-র সরকার। ফলে মানবাধিকারের বিশ্ববন্দিত প্রতিমা সু চি’র হৃদয়ের উষ্ণতার বাইরে রোহিঙ্গারা। তারা বেওয়ারিশ।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়।
এক সময়ে ব্রিটিশদের দখলে আসে এ ভূখণ্ড। তখন বড় ধরনের ভুল করে তারা এবং এটা ইচ্ছাকৃত কিনা, সে প্রশ্ন জ্বলন্ত। তারা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ ধরনের বহু ভূল করে গেছে ব্রিটিশ শাসকরা।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ জনগোষ্ঠীর কয়েকজন সরকারের উচ্চপদের দায়িত্বও পালন করেন।
কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে।
হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অনেকের কাছেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ‘কালা’ নামে পরিচিত। বাঙালিদেরও তারা ‘কালা’ বলে। এ পরিচয়ে প্রকাশ পায় সীমাহীন ঘৃণা।
অন্য সরকার কী করেছে, কী করেনি, সে প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু সু চি-র সরকার থাকাকালীন এমন মানবতা-বিরোধী কাজ হয়েই চলেছে, আর তিনি মৌন! সু চি-র আজীবন লড়াই ছিল মানবাধিকারের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। অন্তত বিশ্ববাসী তা-ই জেনে এসেছিল। আমরাও তাই জেনেছি। অথচ এই বিশ্বনন্দিত নেত্রী এখন নীরবতা দিয়ে নিজের জনসমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
ক্ষমতাকে ধরে রাখতে চাইছেন। ধিক এই মানবতাহীন ক্ষমতার চর্চা। রোহিঙ্গাদের উপর অব্যাহত গণ-অত্যাচারের সামনে তিনি যে কেবল নীরব থেকেছেন তা-ই নয়, যে কয়েকটি মন্তব্য করেছেন তাতে স্পষ্ট যে, তিনি রোহিঙ্গাদের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারবাসীর কাছে, এমনকী তার দলের লোকজনের কাছেও অপ্রিয় হতে চান না।
এর আগে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজেতা সু চি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা তো বাঙালি। ওরা আদৌ এ দেশের নাগরিক কি না দেখতে হবে।’ আরও বলেছেন, ‘ওদের প্রতি যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা আইনসঙ্গত।’ প্রশ্ন হলো শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সাং সু চি কি এত দিন তা হলে বেছে বেছে মানবাধিকারের লড়াই লড়ছিলেন?
মানবাধিকারের প্রথম কথাই তো হল, যে কোনো পরিচয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিটা মানুষ, কেবল মানুষ হিসেবেই কিছু মৌলিক অধিকার পাওয়ার যোগ্য! ভেদাভেদ বিচার করে তো মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হয় না! এ তিনি কী বললেন!
আর আইন? এই গণ-অত্যাচার যদি মিয়ানমারের আইন অনুযায়ী হয়, তা হলে তো সবার আগে সু চি’র উচিত আইন-অমান্য আন্দোলন করা। গান্ধীজি ব্রিটিশ রাজের আইন অমান্য করেছিলেন, কারণ তার মতে আইনটাই অন্যায় ছিল। গোড়ায় নাড়া দিয়েছিলেন গান্ধীজি। কিন্তু সু চি পারলেন না কেন? তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি আছে, তাই? নোবেল শান্তি কমিটি সু চিকে বলেছিলেন, ‘ক্ষমতাহীনের ক্ষমতা’। কিন্তু বাস্তবে তিনি ক্ষমতাশীলের হাতের পুতুল হয়ে ক্ষমতাহীনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়েছেন! অথচ সারা বিশ্ব তাকে বন্দনা করে এসেছে নিপীড়িত মানুষের প্রতিভূ হিসেবে!
যা হোক, সু চির মতো ক্ষমতা-কাঙ্গাল নেতৃত্বের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নেই। এই সমস্যা সমাধানে আপাতত বাংলাদেশকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশ্ববিবেককে সঙ্গে নিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের উচিত মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগে ভূমিকা পালন করা। কারণ রোহিঙ্গারা আমাদের দেশের অর্থনীতি, সমাজিক স্থিতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে অবস্থানকারী প্রায় ৮ লক্ষ রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। শুধু আসিয়ানই নয়, জাতিসংঘ, ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে জনমত গঠনের মাধ্যমে মায়ানমারের বিরুদ্ধে সুকঠিন চাপ সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে নেমে পড়া ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না।
চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট।
[email protected]




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close