শুক্রবার ২০ অক্টোবর ২০১৭
  • প্রচ্ছদ » আরও খবর » রহস্যজনক কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার: গোলাম মোর্তোজা


রহস্যজনক কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার: গোলাম মোর্তোজা


সংবাদ সমগ্র - 09.08.2017

বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক, উপস্থাপক ও বাংলা ম্যাগাজিন ‘সাপ্তাহিক’র সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রামপালের ওপর থেকে ইউনেস্কো আপত্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছে একথা সত্য নয়। ইউনেস্কোর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে একথা নেই বলে জানান তিনি।
গোলাম মোর্তোজা প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ইউনেস্কো রামপালসহ সুন্দরবনের পাশে অন্য কোনো ভারী স্থাপনা বা ভারী শিল্প স্থাপনের বিরুদ্ধে। আর এ বিষয়টি তারা পরিষ্কার করে বলেছে। সুতরাং এখানে সত্য-মিথ্যা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি নেই।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
: জনাব গোলাম মোর্তোজা, কিছুদিন আগে ‘রামপালের উপর থেকে ইউনেস্কো আপত্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছে’ বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে। জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক এলাহী চৌধুরীও জোর দিয়ে একথা বলেছিলেন। আপনি এক প্রবন্ধে বলেছেন, সরকারের এই বক্তব্য সত্য নয়? আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে- সরকার কেন অসত্য বলতে যাবে?
গোলাম মোর্তোজা: দেখুন, সরকার কেন অসত্য বলতে চায় তার জবাব সরকারই ভালো দিতে পারবে। তবে আমি যেটা বলতে পারি সেটা হচ্ছে, পোল্যান্ডের মিটিংয়ের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হলো রামপালের ওপর থেকে ইউনেস্কো তার আপত্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তখন আমরা জানার চেষ্টা করলাম আসলে সেখানে কী আলোচনা হয়েছে। মিটিংয়ের খসড়া দেখে আমরা নিম্চিত হলাম যে আপত্তি প্রত্যাহারের মতো কোনো বিষয় নিয়ে সেখানে কোনো আলোচনা হয় নি। তাৎক্ষণিকভাবে আমি ছোট্ট করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিলাম যে সম্ভবত সরকারের এ বক্তব্য সত্য নয়।
তারপর ২/৩ দিন আগে রামপাল নিয়ে ইউনেস্কোর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলো। তখন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চলবে বলে জনাব তৌফিক এলাহি চৌধুরী জানালেন। কোড আনকোড তৌফিক এলাহি চৌধুরী- অন্যান্য ভারী শিল্প স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হবে না।
তখন আমরা খুব পরিষ্কারভাবে দেখলাম রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলবে এরকম কোনো কথা ইউনেস্কোর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ পুনর্বিবেচনা করা বা সেখান থেকে সরিয়ে নেয়ার কথা এর আগে বলেছিল ইউনেস্কো।
আর এবারের প্রতিবেদনে ইউনেস্কোর কথা আরো অনেক বেশি জোরাল। ইউনেস্কোর এবারের প্রতিবেদন পড়ে আমরা জানতে পারি- সত্য বিষয়টি হচ্ছে ইউনেস্কো রামপালসহ সুন্দরবনের পাশে অন্য কোনো ভারী স্থাপনা বা ভারী শিল্প স্থাপনের বিরুদ্ধে। আর এ বিষয়টি তারা পরিষ্কার করে বলেছে। সুতরাং এখানে সত্য-মিথ্যা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি নেই।
রামপালের পাশে সুন্দরবন এবং এখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না এমন কোনো যুক্তি সরকারের কাছে নেই। অর্থাৎ রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে- একথা সত্য। অথচ সরকার বলছে ক্ষতি হবে না। আর ক্ষতি হবে না এ ব্যাপারে সরকারের কাছে যেহেতু কোনো যুক্তি নেই সেই কারণেই আমার ধারনা সরকারের পক্ষ থেকে এই বিভ্রান্তিকর তথ্যগুলো বারবার প্রচার করা হচ্ছে। এছাড়া আর কোনো কারণ আছে বলে আমাদের কাছে মনে হয় না।
: আপনার ভাষায় এই অসত্য তথ্যের কারণে বাংলাদেশ কী বিশেষ কোনো ক্ষতির মুখে পড়তে পারে?
গোলাম মোর্তোজা: দেখুন, বাংলাদেশের মতো দেশের সরকার নিজেদেরকে অসীম ক্ষমতাবান বলে মনে করে। সে কারণে রামপাল নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ বা রামপালের মানুষ কী ভাবলেন সেটা সরকার খুব একটা গুরুত্বের সাথে নেয় না। রামপাল নিয়ে সরকার কোনো বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে এমনটি তাঁরা মনে করছে না। তাঁরা হয়তো মনে করছে একটি অসত্য বারবার বললে সেটি সত্যে পরিণত হবে।
আমার ধারনা এই অসত্য তথ্যগুলো যখন সরকার এবং তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জ্বালানী মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা রামপাল নিয়ে অসত্য তথ্যটি বারবার বলে তখন দেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে ঘটনাটি সত্য নয়। এতে সামগ্রিকভাবে সরকারের ইমেজের ক্ষতি হয় বলে আমি মনে করি। তবে সরকার এমনটি মনে করে বলে মনে হয় না। আর সরকারের প্রকৃত মনোভাব কী তা যদি আপনারা সরকারের কাছে প্রশ্ন করেন তাহলে জানতে পারবেন।
: সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা সত্যিই যদি অসত্য বলে থাকেন তাহলে এরজন্য কী তারা আইনি প্রক্রিয়ার মুখে পড়তে পারেন? সংবিধান বা আইন কী বলছে?
গোলাম মোর্তোজা: আমার কাছে তেমনটি মনে হয় না। আইনগতভাবে, নৈতিভাবে বা সংবিধান অনুযায়ী জনগণের কাছে সরকার অসত্য কথা বলতে পারে না। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি নিয়ে সরকার আইনি প্রক্রিয়ার মুখে পড়বে এমনটি মনে হয় না। কেউ সরকারের বিরুদ্ধে এমন কিছু করতে যাবে বলেও আমার মনে হয় না।
রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করছে, যারা সুন্দরবন বাঁচাতে চাইছে –তাঁরা বিষয়টি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ায় যাবে তেমনটিও মনে হয় না। তাঁদের যে মূল কাজ সেটি হচ্ছে রামপাল নিয়ে সত্য বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং এ বিষয়ে জনমত তৈরি করা। যাঁরা রামপাল নিয়ে আন্দোলন করছে তাঁরা আশা করছে যে সরকার হয়তো জনমতের প্রতিফলনের প্রতি দৃষ্টি দেবে। এটা ছাড়া এ বিষয়ে আর কিছু বলার নেই।
: যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে এত আলোচনা তার এখন কী অবস্থা? সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ কী শুরু হয়েছে?
গোলাম মোর্তোজা: রামপালের সর্বশেষ অবস্থা সেখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। একইসাথে সেখানে রয়েছে এর বিরুদ্ধে জন অসন্তোষ। দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করে যে সুন্দরবনের স্বার্থে সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়া উচিত নয়। তবে সরকার সে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে না বরং একগুঁয়েমি করে অসত্য তথ্য দিয়ে সেখানে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। সরকার এটির নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারবে কি না তা আমরা জানি না। তবে নির্মাণ কাজ চলছে।
: সবশেষে আমরা যে বিষয়টি জানতে চাইছি তা হচ্ছে- অনেক বিরোধিতার পরও সরকার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে চায়। সরকারের এই অবস্থান কেন? আপনার মূল্যায়ন কী?
গোলাম মোর্তোজা: সরকারের এই অবস্থান কেন আমরা তা ঠিক জানি না। এ ব্যাপারে সরকার কারও কাছে ওয়াদাবদ্ধ বা দায়বদ্ধ কী না তাও জানি না। আর আপনি যে প্রশ্নটি করলেন বাংলাদেশের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এই একই প্রশ্ন আমাদেরও। কারণ সুন্দরবন পৃথিবীতে একটি। বিদ্যুৎ কেন্দ্র ১০/২০/৫০ বা একশটি বিভিন্ন জায়গায় তৈরি করা যায় কিন্তু একটি সুন্দরবন তৈরি করা যায় না।
হ্যাঁ রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র না করে অন্য কোনো জায়গায় করলে খরচ হয়তো একটু বেশি পড়বে। কিন্তু রামপালের মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো আরো বহু জায়গা বাংলাদেশে আছে। সেসব জায়গায় অনেকগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা যাবে। তবে একটি সুন্দরবন তৈরি করা যাবে না।
আর সে কারণে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত, যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করে সরকারকে বলা হচ্ছে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ থেকে বিরত থাকুন। তবে সরকার এক অদ্ভূত ও রহস্যজনক কারণে একগুঁয়েমিপূর্ণভাবে অসত্য তথ্য দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। আবারও বলছি সরকার কেন একাজটি করছে সে প্রশ্ন আমাদেরও।#




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close