বুধবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭


মরিয়ম নেছা’ই কি বাংলাদেশ?


সংবাদ সমগ্র - 08.08.2017

মঞ্জুরুল আলম পান্না : মে মাসের ২৮ তারিখের ঘটনা। খবরটি যখন চোখে পড়লো, নিথর হয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। ময়মনসিংহে সন্তানদের অবহেলায় গোয়ালঘরে থেকে শেয়ালের কামড়ে আহত হয়েছেন এক মা। নব্বই বছরের সেই মায়ের নাম মরিয়ম নেছা। ফুলবাড়িয়া উপজেলার তেজ পাটুলি গ্রামের হতভাগা সেই মায়ের তিন সন্তান। স্বামী মারা গেছেন চল্লিশ বছর আগে। তিন-তিনজন সন্তান থাকা সত্ত্বেও পেটের ক্ষুধায় ভিক্ষাবৃত্তিতে নামেন বছর কয়েক আগে। হাঁটার ক্ষমতা হারানোর পরে রাতে ঘুমানোর জন্য তাঁর ঠিকানা মেলে এক ছেলের গোয়ালঘরে।
এই হলো মূল্যবোধ ধ্বসে পড়া একটা ভঙ্গুর সমাজের নিষ্ঠুর চিত্র। এরকম অনেক মা নিশ্চয় আমাদের আশপাশে রয়েছেন। তাঁদের কারো কারোর খবর হয়তো জানি, বেশীরভাগই জানি না। সব খবরও গণমাধ্যমে উঠে আসে না। বগুড়ায় দলীয় ক্যাডার দিয়ে এক ছাত্রীকে বীরদর্পে ঘর থেকে তুলে নিয়ে নিজ বাড়িতে ধর্ষণ করলো শ্রমিক লীগের এক নেতা।


সেই ঘটনা ধামাচাপা দিতে ধর্ষকের পরিবারের সদস্যরা ধর্ষিতা নারী আর তার মাকে আবার তুলে নিয়ে গিয়ে চার ঘণ্টা ধরে নির্যাতনের পর মাথা ন্যাড়া করে দিলো। সেই বর্বরতার কাহিনী গণমাধ্যমে উঠে এলো অনেক পরে।
সবাই আমরা আত্মকেন্দ্রীক হয়ে উঠছি, স্বার্থান্বেষী হতে গিয়ে অপরাধকে অপরাধ বলে গণ্য করছি না। খানিক সুখে থাকাই সেখানে যে কোন কিছুর চেয়ে বড় হয়ে উঠছে। রয়েছি যে যার মতো। প্রতিবাদের ভাষাগুলোয় মরিচা পড়ে গেছে। স্বার্থপরতায় একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভাঙতে ভাঙতে সবাই আমরা একা হয়ে পড়ছি। নাড়ি ছেঁড়া ধন যে সন্তান, সে খোঁজ নিচ্ছে না অসহায় মায়ের, ভাই হয়ে উঠছে ভাইয়ের শত্রু। পরকীয়ায় জড়িয়ে মা হত্যা করছে সন্তানকে। নেশায় মত্ত হয়ে সন্তান হত্যা করছে মা-বাবাকে।
ভূমিষ্ট হওয়ার আগেই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান মায়ের গর্ভে শিশুকে গুলিবিদ্ধ হতে হয়। ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুন, শিক্ষক হামলে পড়ছে ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর। মসজিদ-মন্দির-গীর্জা কোন উপসনালয়ই নিরাপদ নয়। এটা কী শুধু সমাজের চিত্র না কি পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি?
অনাদরে অবহেলায় পুরো দেশটাই আজ মস্ত এক হাসপাতাল। বাংলাদেশের আরেক নাম কি এখন মরিয়ম নেছা? ময়মনসিংহের ওই মায়ের মতোই অবহেলায় আর অনাদরে থাকা পুরো দেশটাকেই শেয়ালে কামড়াচ্ছে। একটা দুইটা নয়, অনেক শেয়াল। মৌলবাদী শেয়াল, শাসক নামের শেয়াল, বিরোধী দল নামের শেয়াল, লুটেরা ব্যবসায়ী শেয়াল, দুর্নীতিবাজ প্রশাসন শেয়াল, মার্কিন-ভারত নামের শেয়াল, পাহাড়ে বাঙালী নামের শেয়াল, ধর্ষক শেয়াল। চারিদিকে এতো এতো শেয়াল, সব শেয়ালকে চেনাও যায় না।
সব শেয়াল ছুটছে টাকার পেছনে, পুঁজির পেছনে। আরও… আরও ভালো থাকার জন্য। বই পড়া আন্দোলনের নায়ক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, ‘প্রতিযোগীতার হাতে পড়ে মানুষ শুধু অসুস্থের মতো ছুটছে। থামার উপায় নেই। দুই দু গুণে চার। চার দু গুণে আট। আট দু গুণে ষোল, বত্রিশ, চৌষট্টি। এর শেষ নেই। এ থেকে মুক্তি নেই।’
ডাক্তার শহরে বেশী রোজগারের লোভে গ্রামের প্রান্তিক মানুষগুলোর পাশে থাকতে চান না। শিক্ষক ক্লাসে মনযোগী না হয়ে কোচিং-এ যান দু-পয়সা বেশী কামানোর আশায়, এক শ্রেণীর সাংবাদিক গাড়ি বাড়ি করার জন্য তার পেশার মহত্তকে ভুলে যান। এক শ্রেণীর পুলিশ ঘরে-বাইরে, অলিতে গলিতে হানা দিয়ে নিরীহ মানুষকে তুলে নিয়ে চাঁদা দাবি করছে, অন্যথায় চলে অমানসিক নির্যাতন কিংবা মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে জেল হাজতে।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মানুষের নির্মম নির্যাতন- লিমন, কাদের, রাব্বীর মতো এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে চোখের সামনে। ছাত্র নেতাকে দেখা যায় হেলিকপ্টারে করে জনসভায় যোগ দিতে। ঠিকাদার বেশী মুনাফা লুটতে গিয়ে ভবনের খুঁটিতে রডের বদলে দেন বাঁশ। গণমাধ্যম এখন আর গণমানুষের কথা বলে না। প্রকৃত সাংবাদিকদের হাতে গণমাধ্যম না থাকলে গণমানুষের চিন্তা আসবে কোত্থেকে? সব এখন কর্পোরেট বাণিজ্য।
ছয় মাসের শিশুকে ধর্ষণ করে পার পেয়ে যায় ধর্ষক, ধর্ষণের বিচার না পেয়ে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনের নিচে আত্মাহুতি দিচ্ছেন অসহায় পিতা। সেনানিবাস এলাকায় সংস্কৃতি কর্মী ধর্ষণের পর খুন হলেও খুনীর সন্ধান মেলে না। মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে যুব সমাজের অনেক বড় একটা অংশ। বিনা বিচারে বছরের পর বছর কারাগারে বন্দী অসংখ্য মানুষ।
মুক্তিযোদ্ধাকে লাঠি পেটা করে ক্ষমতাসীন দলের চ্যালা চামুণ্ডারা। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট, দেশের এক বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর বাজেটের সমান টাকা পাচার হয় বিদেশে, অর্থ পাচার হয়ে ওঠে দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানী খাত।
আমাদের এই দেশ এখন আর গরীব নেই। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে এই বাংলাদেশ। এমন খবরে বুকের ছাতিটা ফুলে ছত্রিশ ইঞ্চি হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস বেশীক্ষণ ধরে রাখা যায় না। আমাদের মাথাপিছু আয় ঠেকেছে না কি ষোলশো ডলারে। কম কথা নয়! কিন্তু এই হিসেব করা হয় কীভাবে? মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক আর ৮০/৮৫ শতাংশ মানুষ খেয়ে পরে হয়তো কোন রকমে বেঁচে আছেন। এসবের গড় হিসেবইতো ওই ষোলশো ডলার।
দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে সত্য কথা। কিন্তু মানুষের কথা বলার অধিকার না থাকলে, গণতন্ত্র না থাকলে উন্নয়ন দিয়ে কী হবে? মুক্তিযুদ্ধের মূল স্পিরিট এবং পবিত্র সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি ‘গণতন্ত্রকে’ দূরে রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করা যায় না। শত শত মানুষ বছরের পর বছর নিখোঁজ হয়ে আছেন। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা না থাকলে এতো এতো উন্নয়ন দিয়ে কী হবে?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে রেখে মৌলবাদের সঙ্গে আপস করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের পাঠ্য বইয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢুকিয়ে দেয়া হয়। একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং ব্যবসার দৌরাত্ম্য উদার হস্তে নম্বর বিলিয়ে গণহারে জিপিএ ফাইভ পাইয়ে দিয়ে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ পঙ্গু করে ফেলা হচ্ছে।

দুর্নীতিতে পর পর তিনবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অপবাদ কাটিয়ে উঠতে পারলেও গত বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আমাদের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্নে। দুর্নীতিবাজ প্রশাসনের কারণে অসময়ে বানের পানি কেড়ে নেয় কৃষকের সোনার ধান। মরা ধান ডুব দিয়ে কাটতে গিয়ে মরতে হয় সর্বহারা কৃষককে। নব্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ভারতকে খুশী রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবনকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নের নামে।
যে সব অন্যায় অনাচারের কথা বলছি বুকের গভীরে জমানো কষ্ট নিয়ে- এগুলো নতুন কিছু নয়। দুই-তিন দশক ধরে এর প্রায় সবই আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে খামচে আছে অক্টোপাশের মতো।
আমরা ভুলে যায়নি সারের দাবি জানানো সভ্যতার শ্রেষ্ঠ কারিগর কৃষকের বুকে গুলি করার কথা, ভুলে যায়নি বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলনরতদের বুক গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়ার কথা, ভুলে যায়নি বাবা-মায়ের সামনে পূর্ণিমা শীলকে গণধর্ষণের পৈশাচিক ইতিহাস কিংবা ধর্ষণে সেঞ্চুরী এক ছাত্র নেতার উৎসব উদযাপনের কাহিনী।
আমাদের দেশের প্রধান দুই শাসক দল দুই মেরুতে অবস্থান করলেও অভিন্ন স্বার্থে তারা এক। ভোটের রাজনীতির সমীকরনে হেফাজতকে কাছে রাখতে মরিয়া দুই দলই। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ন্যায় বিচারের প্রতীক হিসেবে নির্মিত লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্য ভাঙা গড়ার খেলায় দুই দল এক মেরুতে। সংসদে সাংসদের বেতন ভাতা বাড়ানো ইস্যুতে ঐকমত্য থাকে তাদের গলায় গলায়। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে দুই দলই বিচার শালিস নিয়ে যায় মার্কিন-ভারতের কাছে।
বাম রাজনেতাদের অনেকে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ঠ ভোগের আশায় নিজেদের বিকিয়ে দেন শাসকগোষ্ঠির পায়ের কাছে। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতাশালী থেকে আরও বেশী ক্ষমতাশালী হতে পেশী শক্তির রাজ্য গড়ে তুলতে চান, আর তা করতে প্রয়োজন অনেক অনেক টাকার। টাকার পাহাড় গড়তে গিয়ে, নিজের শক্তি গড়তে গিয়ে অনুগত নেতা-কর্মীদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন সব ধরনের অনৈতিক কাজে, অপরাধ কর্মকাণ্ডে।
এ এক দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এক পক্ষ ক্ষমতায় টিকে থাকতে করে ভোটারবিহীন নির্বাচন, আরেক পক্ষ ক্ষমতায় যেতে মানুষ মারে পেট্রোল বোমায় আর আগুনে পুড়িয়ে। আর সেই সুযোগে রাজনৈতিক শূন্যতা আর দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রে উত্থান ঘটে জঙ্গিবাদের। সব কিছুর পেছনে দায়ি কি এই নষ্ট রাজনীতি নয়?
অজানা এক ভয়ে মানুষ সত্য বলতে পারছে না। রাজনীতি বিভক্ত করেছে সাংস্কৃতিক কর্মীদের, শিক্ষক আর মুক্তিযোদ্ধাদের। কথা বলবেন কে? সবাই যার যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত, সবাই ভীত সন্ত্রস্ত পাছে কিছু হারানোর।
এ বড় অস্থির সময়। মানুষ হয়তো খানিকটা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, কিন্তু একটার প্রতিবাদ করতে না করতেই আরেক অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে জানায় প্রতিবাদ, পুরানো প্রতিবাদ মিলিয়ে যায় নতুনের মাঝে। এই বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় যে আওয়ামী লীগের কাছে ছিলো সংখ্যা গরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, সেই আওয়ামী লীগ তার আসল চরিত্র হারিয়ে হাঁটছে উল্টো পথে।
এতো কিছুর পরও আমরা হতাশ হতে চাই না। আলোর বিচ্ছুরণে কখনও কখনও জেগে উঠি নতুন উৎসাহে। জেগে উঠি গণজাগরণ মঞ্চের জাগরণে, চার দশক পর হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে লাখো শহীদের জয়গানে। বিধ্বস্ত রানা প্লাজার মধ্য থেকে ক্ষত বিক্ষত মানুষগুলোকে উদ্ধারে যখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবাই এক হয়, স্কুল পড়ুয়া কিশোরীরা যখন নিজেরাই তাদের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জ্বলে ওঠে আলোকবর্তিকা হয়ে তখন আবার জেগে ওঠার চেষ্টা করি।
ময়মনসিংহে শেয়ালে কামড়ানো অসহায় মায়ের দায়িত্ব যখন নেন একজন সংসদ সদস্য, জেগে ওঠার চেষ্টা করি নতুন নতুন স্বপ্নবাজ হয়ে। এতো এতো অস্থিরতা আর ভাঙনের মাঝে সামান্য ক্রিকেট খেলা সব কিছু ভুলিয়ে আমাদেরকে হঠাৎ হঠাৎ দিয়ে যায় স্বর্গসুখ। আমাদের চাওয়া পাওয়াতো খুব বেশী নয়।
হাসপাতালে মরিয়ম নেছার কাছে সাংবাদিকরা তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ক্ষীণ কণ্ঠে বলেন, ‘আগের চেয়ে একটু ভালো’। হাতের মুঠো দেখিয়ে বলেন, ‘আমারে তিন বেলা একটু ভাত দিলেই অইব।’ সবার জন্য এক মুঠো ভাত আর এক মুঠো শান্তি নিশ্চিত কি এতটাই কঠিন?
মঞ্জুরুল আলম পান্না: সাংবাদিক, কলাম লেখক।
[email protected].com




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close