মঙ্গলবার ২২ অগাস্ট ২০১৭


শ্যামা মেয়ে ও বর্ণবাদী চোখ


সংবাদ সমগ্র - 29.07.2017

মেহেদী রাসেল : বিয়ের বাজারে কালো মেয়ের দাম কম। কথাটা খুব অপ্রিয় একটি সত্য। অন্তত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটি অতি সাধারণ এক চিত্র। চিত্রটির মধ্যে সংগোপনে লুকানো রয়েছে বর্ণবাদ। এমনকি পাত্র নিজে যদি কালোও হন, তবু তিনি অধিকাংশ সময়ই আকাঙ্ক্ষা করেন ফরসা পাত্রী। বেশির ভাগ সময় মানুষ যে জেনে বুঝে বর্ণবাদী আচরণ করেন, সেরকম নয়। মানুষ অজান্তেই তার চরিত্রের ভেতর বয়ে নিয়ে বেড়ায় বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা।
এটি আসলে সমাজ কাঠামোর মধ্যে থাকা বহু বছর ধরে চর্চিত অভ্যাস ও মানসিকতার ফল। আমরা কি এই মানসিকতা থেকে বের হতে পারি না? কিংবা এটি পরিবর্তন করতে পারি না? এই প্রশ্নের উত্তরেও চলে আসে আরেকটি প্রশ্ন, আমরা আসলেই সেটা থেকে আদৌ বের হতে চাই কিনা?


বলিউডের একজন নামী অভিনেতা নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী। তিনি সম্প্রতি বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টে সে অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। অবশ্য কে তার সঙ্গে এ ধরণের আচরণ করেছেন সেই নামটি তিনি উল্লেখ করেননি। তার টুইট থেকে এটুকু নিশ্চিত হওয়া যায়, বলিউডি সিনেমার সঙ্গে জড়িত কেউ একজন তাকে বলেছেন, ফরসা অভিনেত্রীদের সঙ্গে তার অভিনয়ের রসায়ন জমবে না, কারণ নওয়াজের গায়ের রং কালো।
বলিউডের একজন শীর্ষ পর্যায়ের অভিনেতার ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা মোটামুটিভাবে এই উপমহাদেশের সামগ্রিক বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
সাদা কালোর এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আসলে আমরা বের হতেই চাই না। বরং এটিকে পরিচর্যা করি। বাংলাদেশে সর্বশেষ যে ঘটনায় সাধারণ মানুষের ভেতরকার বর্ণবাদী মনটা বের হয়ে এসেছিল সেটা হলো অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমুর বিয়ে। একজন উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত ব্যক্তিকে গত বছর বিয়ে করেন ছোট পর্দার জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী। কিন্তু গোল বাধাল বরের গায়ের রং। তিনি কেন কালো রংয়ের ছেলেকে বিয়ে করলেন- এতে ক্ষুব্ধ হলো তার ভক্তরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক তোলপাড় হলো বিরূপ প্রতিক্রিয়ায়। বিয়ে একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার, সেখানে অন্যের মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই। তবু আমরা যেচে মতামত দেওয়া শুরু করলাম। অত্যন্ত রুচিহীনভাবে আমাদের ভেতরের কুৎসিত মনটা বাইরে এনে সবাইকে দেখালাম। স্বভাবতই এ ধরনের অনভিপ্রেত আচরণে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন সুমাইয়া শিমু।
দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এত উচ্চশিক্ষিত একটা ছেলে, আন্তর্জাতিক একটি সংস্থায় বেশ বড় একটি পদে চাকরি করেন, তাকেও আক্রান্ত হতে হলো শুধু মাত্র গায়ের রংয়ের কারণে!
সারা দুনিয়ার রং ফরসাকারী ক্রিম এবং অন্যান্য প্রসাধনীর ব্যবসা যে আজ এত জমজমাট, তার পেছনেও কিন্তু লুকিয়ে আছে মানুষের বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। যেন ফরসা না হতে পারলে মানবজনম বৃথা। যেন ইহকালের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো ফরসা হওয়া। কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের প্রসারের জন্য নির্মিত বিজ্ঞাপনে আপনাকে দেখায়, আপনি একমাত্র ফরসা হতে পারলেই হতে পারবেন সফলতম মানুষ, একে একে সাফল্যের সিঁড়িগুলো তরতর করে পেরিয়ে যাবেন।
যেন আপনি কালো হলে কখনো সফলতার মুখ দেখবেন না কোনোদিন। রং ফরসাকারী এসব প্রসাধনী কোম্পানির বিরুদ্ধে তবু সোচ্চার হতে দেখা যায় না খুব একটা। এর কারণ প্রধানত, মানুষ বর্ণবাদ নিয়ে এখনও ওই মাত্রার সচেতন নয়। আর এদের পুঁজির দাপটও খুব বেশি।
শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বেই মানবতার অন্যতম প্রধান শত্রু হলো বর্ণবাদ। বিশ্বের সকল দেশের মানুষেরই বর্ণ বৈষম্যের কোনো না কোনো অভিজ্ঞতা রয়েছে। পশ্চিমা দুনিয়া ‘রেসিজম’ শব্দটিকে বাংলায় আমরা বলছি ‘বর্ণবাদ’। যদিও পশ্চিমা রেসিজম শব্দটির মধ্যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, লিঙ্গ বৈষম্যসহআরও নানা বৈষম্যের অনুষঙ্গ রয়েছে। সাদা চামড়ার লোকেরা এক সময় কালো বর্ণের মানুষকে মানুষই মনে করতো না।
কয়েক দশক আগেও কালোদের সঙ্গে গণপরিবহনে তারা একই আসনে বসতেন না। সারা দুনিয়ায় কালোদের মনে করা হতো দাস। সাদা চামড়া হলো প্রভু আর কালো হলো দাস। আজকের দুনিয়ায় সাদা কালোর প্রভেদ অনেক কমেছে, তবু একদম শেষ হয়ে যায়নি এই বৈষম্য। মাঝে মাঝেই বিশ্বের নানা প্রান্তে এই সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। ইউরোপীয়রা যে এশীয় অঞ্চলের মানুষকে ‘ডার্টি এশিয়ান’ বলে গালি দেয়, সেটিও ভয়ংকর একটি বর্ণবাদী আচরণের মধ্যেই পড়ে।
ফুটবল মাঠ থেকে শুরু করে বিপণীবিতান, সবখানে চলে বর্ণবাদী চর্চা। পশ্চিমা ফুটবলে প্রায়শই নানা দলের সমর্থকদের বর্ণবাদী আচরণের খবর গণমাধ্যমে ছাপা হয়। এর কারণে কোনো কোনো দলের সমর্থকদের এক ম্যাচ বা দুই/তিন ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়, ফলে দর্শকশূন্য ফাঁকা স্টেডিয়ামেও মাঝে মাঝে খেলতে দেখা যায় দলগুলোকে।
ইউরোপ বা আমেরিকায় যে আফ্রিকান কিংবা এশীয় ছেলেটি বেড়ে ওঠে, ছোটবেলা থেকেই সে বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়। ফলে, সাদাদের সে ঘৃণা করতে শেখে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে সেও এক প্রকার বর্ণবাদী চর্চার মধ্যে ঢুকে পড়ে। এক বর্ণবাদ উৎসাহিত করে আরেক বর্ণবাদকে। এভাবেই সমাজে-সংস্কৃতিতে জারি থাকে বর্ণবাদ। ঘৃণার মাধ্যমে কেবল আমরা ঘৃণাই শিখতে পারি। আর ভালোবাসা মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় ।
শুধু সাদা কালো নয়, আঞ্চলিক বর্ণবাদ এবং ধর্মীয় বর্ণবাদ, যাকে আমরা সাম্প্রদায়িকতা বলি, সেটি আজ বিশ্বের বৃহত্তর সমস্যাগুলোর একটি। বিশেষ করে টুইন টাওয়ার হামলার পর সারা বিশ্বের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে বদলে যায়। ঢালাওভাবে মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, পৃথিবীর নানা প্রান্তে তাদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা বাড়তে থাকে।
পশ্চিমা সমাজে মুসলমানদের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তার পেছনে গণমাধ্যমের দায়ও কম নয়। টুইন টাওয়ার হামলার পর বিশ্বের মানুষের বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ভদ্রতার খোলস ছেড়ে বাইরে চলে আসে। বিশ্বের নানা প্রান্তে একটি বিশেষ ধর্মের মানুষ ‘হেইট ক্রাইমে’র শিকার হয়। হেইট ক্রাইমের অংশ হিসেবে ব্রিটেনে গত ১২ মাসে প্রায় ৪০০টি অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটে। চিত্রটি বেশ ভয়াবহ।
অথচ মুসলমান মাত্রই সন্ত্রাসী নয়, মুসলমান মানেই হামলাকারী নয়, একটি বিশেষ ধর্মের সব মানুষ খারাপ হতে পারে না, সেটি যেকোনো শিশুরও বোঝার কথা। কিন্তু যাদের মন বর্ণবাদী হওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে, যাদের অন্তরে লুকানো থাকে সাম্প্রদায়িকতা, তারা কোনো যুক্তির ধার ধারে না।
ট্রাম্পের আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন কালো মানুষদেরই একজন-বারাক ওবামা। ভারতে গত সপ্তাহে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন যে রামনাথ কোবিন্দ তিনিও একজন দলিত সম্প্রদায়ের লোক। এই উদাহরণগুলো আসলে তখন আর কোনো অর্থই বহন করে না, যখন বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রতিনিয়ত গাত্রবর্ণ কিংবা ধর্মের কারণে নিপীড়িত হতে হয় মানুষকে। আমাদের বর্ণবাদী মন যখন আমাদের অজান্তেই আমাদের ভেতর ওঁত পেতে বসে থাকে।
মানুষে মানুষে যে বৈষম্য তার ধর্ম, গোত্র, ভাষা কিংবা গায়ের রংয়ের জন্য প্রকট হয়ে ওঠে, সেটা আরোপিত। মূলত শোষণের জন্যই এই ভেদাভেদ তৈরি করে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয় একদল সুবিধাবাদী মানুষ। প্রকৃতপক্ষে সব মানুষই সমান। মানুষের সমাজে উঁচু নিচু ভেদ থাকা স্বাভাবিক নয়। বৈচিত্র্যের কারণেই পৃথিবীটা এত সুন্দর। বৈচিত্র্যের কারণেই একজন মানুষ আরেকজনের চেয়ে ভিন্ন হয়, উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট নয়।
মেহেদি রাসেল: সাংবাদিক, গল্পকার ও কলামিস্ট।
[email protected]




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close