মঙ্গলবার ২২ অগাস্ট ২০১৭


নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ!


সংবাদ সমগ্র - 29.07.2017

প্রভাষ আমিন : সন্দেহ নেই বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাইনবোর্ড। এই সাইনবোর্ড দেখিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করতে পারতো। বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশ আরো প্রভাববিস্তারী হতে পারতো। কিন্তু হয়েছে উল্টো।


বারবার ড. ইউনূসের কারণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়, প্রশ্নের মুখে পড়ে। সে দায় কতটা সরকারের, কতটা ইঊনূসের তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে ড. ইঊনূসের কারণে যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল না হয়ে উল্টো ক্ষুন্ন হয়, এটাই এখন বাস্তবতা। সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখন ইতিবাচক।
অর্থনৈতিক সক্ষমতাও আগের চেয়ে বেড়েছে। প্রায়শই বাংলাদেশে নানা আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়। এই যেমন এখন ঢাকায় হচ্ছে আন্তকর্জাতিক পানি সম্মেলন। প্রতিটি সম্মেলনেই আমাদের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও উজ্জ্বল হয়। ২৮-২৯ জুলাই সাভারের জিরাবোর সামাজিক সম্মেলন কেন্দ্রে হওয়ার কথা ছিল সামাজিক ব্যবসা দিবস উপলক্ষ্যে সপ্তম সম্মেলন। ঢাকার ইউনূস সেন্টার এ সম্মেলনের আয়োজক। সব আয়োজন সম্পন্ন।
সম্মেলনে অংশ নিতে ৫০টি দেশের অন্তত ২ হাজার মানুষ অংশ নেয়ার কথা ছিল। অন্তত ৪০০ বিদেশী অতিথি সম্মেলনে অংশ নিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন। তাদের মধ্যে ২০০ অতিথি ঢাকায় পৌছেও গিয়েছিলেন। সম্মেলনের মূল বক্তা হিসেবে ঢাকায় এসেছেন জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব থমাস গাস, যিনি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য কর্মসূচি-এসডিজি বাস্তবায়নের প্রধান কর্মকর্তাও।
কিন্তু সম্মেলনের আগের দিন পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক জানিয়ে দেন, পর্যাপ্ত সময় দিয়ে আবেদন না করায় তারা সম্মেলনের অনুমতি দিতে পারছেন না। সন্ধ্যায় ইউনূস সেন্টার অনিবার্য কারণে সম্মেলন বাতিল করার ঘোষণা দেয়। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবসহ অন্তত ২০০ বিদেশী পৌছে যাওয়ার পর এমন একটি সম্মেলন বাতিল করাটা অবশ্যই বাংলাদেশের মর্যাদার জন্য হানিকর।
সম্মেলনের অনুমতি চাওয়া নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। আইজিপি দাবি করেছেন, ২৪ জুলাই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। আর ইউনূস সেন্টারের দাবি তারা ২০ জুলাই আবেদন করেছিলেন। আমি দুই পক্ষের
বক্তব্যই সত্য বলে ধরে নিচ্ছি। হয়তো ইউনূস সেন্টার ২০ জুলাই-ই আবেদন করেছে।
বাংলাদেশের প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেটাই হয়তো ২৪ জুলাই হয়ে গেছে। কিন্তু ২০ হোক আর ২৪ জুলাই হোক, এত বড় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের জন্য সেটা কি পর্যাপ্ত সময়? আইজিপি বলেছেন, এত কম সময়ে এমন একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলেই তাদের সম্মেলন আয়োজনের অনুমতি দেওয়া যায়নি। এর সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
এ ধরনের কোনো সম্মেলন আয়োজনের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্মিলিত সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে আয়োজক সংস্থার চাহিদা পূরণ করা হয়। কিন্তু মাত্র তিন দিন আগে এমন একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা বলে নিরাপত্তা চাইলে তা দেওয়া সম্ভব নয়। তারা ঢাকা জেলার এসপির কাছে সম্মেলনের নিরাপত্তা চেয়েছে। এসপি তাদের জানিয়েছেন, এত বড় অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা তিনি একা দিতে পারবেন না। প্রস্তুতির জন্য সময় লাগবে।
অথচ এখন তারা বিভিন্ন জায়গায় বলে বেড়াচ্ছে সরকার তাদের সম্মেলন বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এটা সত্য নয়। আইজিপির বক্তব্যের সাথে আমি পুরোপুরি একমত নই। তবে নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের স্পর্শকাতরতাটা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয় না। বিশেষ করে গতবছরের হলি আর্টিজানে হামলার পর বিদেশীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকার একটু বেশিই সতর্ক।
তাই জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবসহ ৪০০ বিদেশী অতিথি যেখানে উপস্থিত থাকবেন, এমন একটি সম্মেলনের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার বেশি ভাববে এটাই স্বাভাবিক। বেশি সতর্ক থাকা আর বাতিল করে দেয়া তো এক কথা নয়। আমি বিশ্বাস করি, সময় কম হলেও সরকার আন্তরিক হলে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে সম্মেলনটি করতে দিতে পারতো। এটাও বুঝি, সম্মেলনের অনুমতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত যতটা না নিরাপত্তাজনিত, ততটাই রাজনৈতিক।
ড. ইউনূসের সাথে বর্তমান সরকারের যে বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক তাতে সরকারের পূর্ব অনুমতি না নিয়ে ইউনূস সেন্টারের এমন একটি সম্মেলনের আয়োজেনে মাঠে নামাই ঠিক হয়নি। ইউনূস সেন্টারের আগেই বুঝে নেয়া উচিত ছিল, সরকার ড. ইউনূস আয়োজিত কোনো সম্মেলন নির্বিঘ্নে হতে দেবে কিনা।
দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ীর সাথে সরকারের ক্রমাগত বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ ঠিক না বেঠিক, ড. ইউনূস যে বাংলাদেশের কোনো সঙ্কটে কখনো পাশে থাকেন না; তা নিয়ে আলাদা বিতর্ক হতে পারে। আমি মনে করি, বয়স পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও
গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকতে চেয়ে ড. ইউনূস ভুল করেছিলেন। বয়সের সীমা সংক্রান্ত আইন সবার জন্য সমান।
শেষ পর্যন্ত ড. ইউনূস বিষয়টিকে আদালতে নিয়ে গেছেন এবং আদালতে হেরে গ্রামীণ ব্যাংক ছেড়েছেন। আমি মনে করি, এখানেই থেমে যেতে পারতো সরকার। কিন্তু ড. ইউনূসের সব বিষয়েই বাগড়া দেয়ায়, ব্যক্তিগত বিদ্বেষের প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে। আর আমি এটাও মনে করি, ড. ইউনূস চাইলে জাতির অভিভাবকের আসনটি নিতে পারতেন।
তিনি তার ভাবমূর্তি ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যবহার করে বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নিতে পারতেন। বিশেষ করে পদ্মা সেতু, জিএসপি সঙ্কটে তিনি বাংলাদেশের পাশে থাকতে পারতেন। কিন্তু তা না করে, তিনিও তার বিশালত্বকে খাটো করেছেন।
কিন্তু এখন প্রশ্ন সামাজিক ব্যবসা সম্মেলনকে ঘিরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির। হতে পারে আয়োজক ইউনূস সেন্টার বা ড. মোহাম্মদ ইউনূস। তাই বলে আন্তর্জাতিক একটি সম্মেলনের আগের দিন তা বাতিল করতে হবে! দেশটা তো শুধু ড. ইউনূসের
একার নয়। সম্মেলন বাতিল হওয়ার আগেই যে ২০০ অতিথি চলে এসেছিলেন, তারা দেশে ফিরে বাংলাদেশ সম্পর্কে কী বলবেন?
বাংলাদেশটা তো আমাদের সবার। এই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হলে আমাদের সবারই খারাপ লাগে। বিদেশী অতিথিরা আসার আগেই পুলিশ তৎপর হতে পারতো। পুলিশের দাবি অনুযায়ী ২৪ জুলাই আবেদন পাওয়ার সাথে সাথেই তারা না করে দিতে পারতো। তাহলে আর বিদেশী অতিথিরা এসে বিব্রত হতেন না। আর নইলে, সর্বোচ্চ চেষ্টা সম্মেলনটি শেষ করতে দিতে পারতো।
অনুমতি আগের দিন পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখে আসলে ড. ইউনূসকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু ইউনূস নয় শুধু, বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ। ইউনূসকে হেয় করতে গিয়ে যারা বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে তারা অবশ্যই বাংলাদেশের বন্ধু নয়। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ যাওয়াটা অবশ্যই ভালো কিছু নয়।
অবশ্য আমার ধারণা, নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার চেষ্টাটা ইউনূস সেন্টারের পক্ষ থেকেও ছিল। সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না জেনে তাদের এত বড় একটি আয়োজনে নামাই উচিত হয়নি। ইউনূস সেন্টারও হয়তো এতজন বিদেশী
অতিথিকে দেশে এনে সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করতে চেয়েছে। তারা হয়তো ভেবেছে, এতজন সম্মানিত অতিথি চলে এলে সরকার না করতে পারবে না।
আর না করলেও, অতিথিদের কাছে সরকার যে খুব খারাপ, তারা যে ইউনূসকে দেখতে পারে না; এটা রসিয়ে রসিয়ে বলা যাবে। হতে পারে ড. ইউনূসই বাংলাদেশকে বিপাকে ফেলতে শেষ মুহুর্তে অনুমতি চাওয়ার এই ফাঁদ পেতেছেন। কিন্তু সেই ফাঁদে সরকার পা দিল কেন?
ইউনূস সেন্টার কি সরকারের চেয়ে দক্ষ, যোগ্য, ধূর্ত? সামাজিক ব্যবসার সম্মেলনটি না হওয়াতে কার লাভ হলো, কার ক্ষতি হলো? ইউনূস সেন্টারের কোনো ক্ষতি হয়নি। অতিথিদের তারা বলতে পারবে, দেখো আমাদের কিছু করার নেই। সরকার অনুমতি দেয়নি বলে আমরা করতে পারেনি। আর ড. ইউনূস এখন বিশ্বে ঘুরে ঘুরে বলতে পারবেন, দেখো, বাংলাদেশের সরকার কত খারাপ।
আমার নামটাই তারা শুনতে পারে না। আর সরকারের তো পুরোটাই ক্ষতি। সম্মেলন হলে তা নিয়ে যতটা আলোচনা হতো, না হওয়ায় হচ্ছে তারচেয়ে বেশি। ড. ইউনূসের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হয়েছে। আসলে সরকার আর ইউনূস সেন্টার, দুই পক্ষই
একটা কৌশলের খেলায় মেতেছিলেন। কত পরে আবেদন করা যায়, কত পরে সে আবেদন বাতিল করা যায়। দুই পক্ষই নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে চেয়েছিল।
কিন্তু নাক কেটেছে বাংলাদেশের, যাত্রাও ভঙ্গ হয়েছে বাংলাদেশেরই।
প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান : এটিএন নিউজ।
[email protected]




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close