বুধবার ২৩ অগাস্ট ২০১৭


নদী, আদুরী আর আমাদের জিঘাংসার গল্প


সংবাদ সমগ্র - 25.07.2017

শুভ কিবরিয়া : নদী আর আদুরীর বিপন্নতার কাহিনী শুভবোধকে বিপন্ন করে তোলে। নদী আর আদুরী দুই বিপরীত কাঠামোর মানুষ। অর্থনৈতিক শ্রেণী বিবেচনায় উঁচু ও নীচু কাঠামোয় তাদের বসবাস। পটুয়াখালীর এক গহীন গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিল একমুঠো ভাতের আশায় আদুরী। অভাবী বাব-মার সংসার ছেড়ে এই এতা দূরে এসে কাজের বিনিময়ে আদুরী চেয়েছিল একটু আদর। একটু ভালবাসা। একটু নিরাপত্তা। শিশুটি গ্রাম ছেড়ে ঢাকা শহরের প্রাণহীন এই নগরে এক চিলতে ভালবাসা আর আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকতেই চেয়েছিল।


কিন্তু নদী তা হতে দেয়নি। নদীও এক বিপন্ন নারী। স্বামী তাকে সুখে রাখেনি। দুঃখ ভর করেছিল তারও জীবনে। সেটাই নাকি তাকে উচ্ছৃংখল আর নৃশংস করে তুলেছিল। তাই বাসায় গৃহকর্মি শিশু আদুরী ছিল তার নৃশংসতার টার্গেট। কেমনতর নৃশংসতা? আদুরীর ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত মৃতপ্রায় শরীর মিলেছিল এক ডাষ্টবিনে।
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বলছে তার হাল, ‘অস্থিচর্মসার দেহ। হাত-পা গুলো শুকিয়ে কাঠি। পাঁজরের সব কটি হাড় গোনা যায়। শরীরে অনেকগুলো পোড়া ও জখমের দাগ। মাথা, ঠোঁট, মুখমণ্ডলেও আঘাতের চিহ্ন। জীবন্মৃত এক শিশু। ডাস্টবিনে এ অবস্থায় ১১ বছরের এক মেয়েশিশুকে খুঁজে পান দুজন নারী। পরে এলাকাবাসী ও পুলিশের সহায়তায় শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশুটি খুবই দুর্বল। অনেক দিন তাকে কিছু খেতে দেওয়া হয়নি।’
পুলিশ আর কিছু মানুষের সহায়তা আর চিকিৎসকদের অবিরাম চেষ্টায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া আদুরীর কাছেই শেষে জানা যায় কারা তাকে এই অবস্থায় ফেলে ডাষ্টবিনে ফেলেছিল।
সেই পাষণ্ড অত্যাচারী, গৃহকর্ত্রীর নাম নওরীন জাহান নদী।
এই নদীর হাতে থাকতো কখনো উত্তপ্ত খুন্তি, কখনোবা ধারাল বটি, কখনোবা গরম ইস্তিরি বা জ্বলন্ত কয়লা।
আদুরী এই অত্যাচারের বয়ান দিয়েছে আদালতে। তার ভাষ্য, ‘আমাকে ঠিকমতো খাওন দিত না। ওর মনে ধরলে পচা ভাত দিত। মরিচের গুঁড়ো দিত। লবণ দিত। এগুলো খাইতে চাইতাম না। জোর করে এসব মারধর করে খাওয়াইতো। আমাকে ব্যালকনিতে ঘুমাতে দিত। জিবের ভেতর গরম কয়লা দিয়ে মুখ চেপে ধরত। এতে আমার জিহ্বা পুড়ে গেছে।’
দুই.
২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মিকে পল্লবীর ডিওএইচএসের একটি ডাষ্টবিনে মুমূর্ষু অবস্থায় পাওয়া যায়। ওই বছর ২৬ সেপ্টেম্বর পল্লবী থানায় আদুরীর মামা নজুল মামলা করেন। ২৯ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। আদুরীকে নির্যাতনের মামলায় চার বছর পর ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন আদালত-৩ মামলার আসামি নওরীন জাহান নদীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন। অন্য আসামি নওরীন জাহান নদীর মা ইশরাত জাহানকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।
আদুরীর জিবের সামনের অংশ নেই। নদী তার জিব পুড়িয়ে দিয়েছে। আগে আদুরী যেভাবে সুন্দর করে কথা বলতে পারত, এখন সেভাবে পারে না। কথা বলতে গেলে কথা জড়িয়ে আসে। আদুরীর মাথার কয়েক জায়গায় কোনো চুল নেই। বটির কোপে তার মাথার এ অবস্থা। হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের সেই ক্ষতে এখনো প্রতিদিন যন্ত্রণা করে।
তিন.
নওরীন জাহান নদীর দুটি সন্তান আছে। আদালতে রায় শোনার পর নদী কান্নায় ভেংগে পড়েন। তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তার বাচ্চা দুটোর কী হবে? তাদের কে দেখবে?
নিজের বাচ্চার প্রতি এই মমতা অটুট থাকা সত্বেও গৃহকর্মি শিশু আদুরীর প্রতি এরকম নৃশংস নির্যাতন কেন করতেন নদী?
আদুরীকে নির্যাতনের কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন নওরীন। আদালতে তিনি বলেন, ১৭ বছর বয়সে ভালোবেসে তিনি বিয়ে করেন সাইফুল ইসলামকে। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে তিনি বরিশালে থাকতেন। ২০১১ সালে আসেন ঢাকায়। স্বামীর সঙ্গে থাকতেন কাঁঠালবাগান এলাকায়। তাঁর স্বামী তাকে মারধর করতেন। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ঢাকায় আসার ছয় মাসের মধ্যে পল্লবীতে মায়ের বাসায় ওঠেন।
এরপর থেকে তার স্বামী আর কোনো খোঁজখবর নিতেন না। টাকাপয়সা নিয়ে মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। আদুরী কাজে কোনো ভুল করলে তার ওপর তার প্রচণ্ড রাগ হতো। তখন হাতের কাছে যখন যা পেতেন, তাই দিয়ে মারতেন। হাতে যখন খুন্তি থাকত, তখন খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতেন। আয়রন থাকলে আয়রন দিয়ে ছ্যাঁকা দিতেন। মুখে আগুন ধরিয়ে দিতেন।।মাথায় ব্লেড দিয়ে কাটতেন। লাঠি দিয়ে পেটাতেন।
চার.
আদালত অবশ্য রায়ে বলেছেন, নদী ঠাণ্ডা মাথার নির্যাতনকারী। ঠাণ্ডা মাথায় তিনি আদুরীকে নির্যাতন করেন। আদালতের ভাষায় আদুরীর ওপর নির্যাতন কেবল মানবতাবিরোধী নয়, তা আদিম ও শয়তানসুলভ। এ ধরনের নির্যাতন সম্ভবত সারা পৃথিবীতে বিরল।
গৃহকর্মি আদুরী এবং গৃহকর্ত্রী নদী বাস করতেন ক্ষমতাকাঠামোর দুই প্রান্তে। সেখানে নির্যাতন সওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না আদুরীর সামনে। নির্যাতনে অচেতন আদুরীকে মৃত ভেবেই ডাষ্টবিনে ফেলেছিল নদী। কপাল ভাল ছিল আদুরীর সেই খোলা ডাষ্টবিনে চোখ পড়েছিল সদয় কিছু মানুষের। নইলে আদুরীর মৃত্যুই নিশ্চিত ছিল।
এখন প্রশ্ন হলো আদালতে নদী নিজের বিপন্নতার যে বয়ান দিয়েছেন শুধু কি তাই তাকে এ রকম নৃশংস করে তুলেছিল?
নাকি, এর পেছনে ছিল অন্য কোনো মনস্তাত্বিক কারণ?
শুধু কাজের ভুলের জন্য যে গৃহকর্মীকে সাজা দেয়া হয় সাধারণভাবে আদুরীকে দেয়া সাজা ছিল তার চাইতে ভিন্নতর। নদীর নিজের ক্ষোভ, ক্রোধ, অক্ষমতা, ঘৃণা একসঙ্গে পুঞ্জীভূত হয়ে নৃশংসতায় পরিণত হতো আদুরীর উপর।
এই ঘটনা আমরা ঘরের মধ্যে দেখি। আমরা দেখি ক্ষমতাবান নদী ক্রমশ কর্তৃত্ববাদি, স্বৈরাচারি, নৃশংস, পাশব হয়ে উঠছে, তার শাসনাধীন থাকা দুর্বল, ক্ষমতাহীন আদুরীর প্রতি।
আমাদের রাষ্ট্র বা সমাজে এই প্রবণতা কী খুব দুর্লভ? আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক আচারে কি এই রকম পাশবিক ঘটনা, জিঘাংসার ঘটনা ঘটছে না?
উল্টোভাবে প্রশ্ন করা যায়, রাষ্ট্রাচারে, আইনে, নিয়মরীতিতে, সুশাসনের সচলতায় এমন কোনো নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি, যা এ রকম পাশবিক রাষ্ট্রিক, সামাজিক, ব্যক্তিক অনাচারকে রুখতে পারে?
পাঁচ.
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। চোখ রাখি ১৯ জুলাই ২০১৭, দৈনিক মানবজমিন সংবাদপত্রের আলোচিত শিরোনামটির দিকে।
৫ জনকে ক্রসফায়ার দিয়েছি, ১৪ জনের লিস্ট করেছি : ডা. এনামুর রহমান
সাভারের বর্তমান এমপি ডা. এনামুর রহমান নির্বাচনী এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মোবাইল ফোনে মানবজমিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, সাভারে অনেক ক্যাডার আর মাস্তান ছিল। এখন সব পানি হয়ে গেছে। কারও টু শব্দ করার সাহস নেই। ৫ জনকে ক্রসফায়ারে দিয়েছি আরো ১৪ জনের লিস্ট করেছি। সব ঠাণ্ডা। লিস্ট করার পর যে দু’একজন ছিল তারা আমার পা ধরে বলেছে, আমাকে জানে মাইরেন না আমরা ভালো হয়ে যাবো। [(ডা. এনামুর রহমানের বক্তব্যের রেকর্ড রয়েছে আমাদের (মানবজমিন) কাছে।)
এলাকায় চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানকার ব্যবসায়ীরা ডাকলেও কেউ চাঁদা নিতে আসেন না। কারণ তারা জানে, এমপি জানলে সমস্যা হবে। ঝুট ব্যবসা নিয়ে আগে কতকিছু হতো। এখন এসব নিয়ে টুঁ শব্দও নেই। প্রধানমন্ত্রী এসবের জন্য আমাকে ডেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
ছয়.
সাভারের বর্তমান সাংসদ যে কথা বলছেন তা যদি সত্যি হয় তবে তার আচরণ কি সুশাসনের সঙ্গে যায়? ক্ষমতাকাঠামোর উপর প্রান্তে বসে তিনি যেভাবে আইন হাতে তুলে খুনের অর্ডার দিচ্ছেন তা কি পাশবিকতা, নৃশংসতা আর অনাচার বিবেচনায় গৃহকত্রী নওরীন জাহান নদীর আচরণের চাইতে কম পাশবিক?
সাভারের সাংসদের এই জিঘাংসা প্রবৃত্তি রাষ্ট্রাচারের অংশ হয়ে উঠছে।
প্রকাশ্যে এই পাশবিকতার কথা বলতে ক্ষমতাবানরা দ্বিধা করছেন না, বরং তার গৌরববোধ হচ্ছে। রাষ্ট্রের এই অসুখই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। যার বলি হচ্ছে ঘরের মধ্যে থাকা অসহায় শিশু আদুরীও।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা ক্ষমতাকারীদের শীর্ষ প্রান্তের এই অসুখ সারাবো, না এই রোগকে ছড়িয়ে দেবো সর্বত্র। সর্ষের মধ্যেকার এই ভূত এখন ছাড়াবে কে?
শুভ কিবরিয়া : সাংবাদিক, কলামিস্ট; নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
kibria34@ gmail.com




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close