বুধবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭


চিকুনগুনিয়া ও মেয়রগণ


সংবাদ সমগ্র - 25.07.2017

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী : আমরা ঢাকা শহরে আসা যাওয়া আরম্ভ করেছি গত শতাব্দীর ছয়দশক থেকে। মফস্বল থেকে আসতাম। সুতরাং উঠতে হতো হোটেলে। পুরানো ঢাকার বাইরে হোটেল ছিল শাহবাগ হোটেল। আর এ শাহবাগ হোটেলটাই হচ্ছে এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আবার এটাকে পিজিও বলে। তখন কোনো তারকা হোটেল ছিলো না। বিদেশীদের ভরসা ছিলো শাহবাগ। তাও নাকি মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন সাহেব বিদেশীদের থাকার অসুবিধার কথা বিবেচনা করে তৈরি করেছিলেন।


১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির পর পূর্ব-পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) রাজধানী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো ঢাকায়। তখনতো সারা বাংলাদেশটাই ছিলো কৃষকের বস্তি। নূরুল আমিন সাহেবকে বলতে শুনেছি তার ঝর্ণা কলমের নিব ভেঙ্গে গিয়েছিলো তা জোগাড় করতে সময় লেগেছিলো নাকি তিনদিন। ঢাকা এখনকার মত এতো বিস্তৃতও ছিলো না। ফার্মগেট পর্যন্ত ছিলো ঢাকা শহর।
১৯৫৬ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তেজগাঁও শিল্প এলাকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। বিমান বন্দর ছিলো ফার্মগেটের পরে অবস্থিত পুরনো বিমান বন্দরটা। তার পরে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। শহরটাতে নাকি মশায় বোঝাই ছিলো। তখন চিকুনগুনিয়াও ছিলো না। ডেঙ্গুও ছিলো না তবে মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হতো। ঢাকায় ম্যালেরিয়া ছিলো স্থায়ী ব্যাধী।
নূরুল আমিনের মন্ত্রী সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। তিনি মাসব্যাপী মশা নিধন কর্মসূচী গ্রহণ করে মশা নিধন করেছিলেন। বিমান থেকে ওষুধও ছিটিয়ে ছিলেন। এতো সুনিপুনভাবে মশা উচ্ছেদ করেছিলো যে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ঢাকায় আর মশা ছিলো না। আমরা নবাবপুর রোড়ে অনেক হোটেলে থেকেছি কিন্তু কখনও মশারী খাটাইনি। কোনো হোটেলে মশারী ছিলোও না।
আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরনো ঢাকায় বড় হয়েছেন। তিনিও স্মরণ করলে বলতে পারবেন যে, পুরনো ঢাকায় তার ছোট বয়সে তিনি মশার উপদ্রব দেখে ছিলেন কিনা।
উত্তরের মেয়র সাহেব বলেছেন তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে মশারী খাটাতে পারবেন না। সে কাজ তিনি পারবেন না তা আমরা জানি। সেটা তার দায়িত্বের মাঝেও পড়ে না। কিন্তু মশা নিধন তো তার দায়িত্বের কাজ তা পারবেন না কেন। আপনারা উভয় মেয়র যে পদ্ধতিতে ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়াবার চেষ্টা করছেন তা দিয়ে কখনও মশা তাড়াতে পারবেন না।
আপনারা হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী যে পদ্ধতি অনুসরণ করে মশা তাড়িয়েছিলেন, অনুসন্ধান করে সে পদ্ধতিটা বের করার চেষ্টা করুন এবং সেভাবে মশা তাড়াবার উদ্যোগ নিন।
সমগ্র গুলশান আবাসিক এলাকায় দিনেও মশার যন্ত্রণায় বসা যায় না। রাত্রে তো ঝাকে ঝাকে মশা উড়ে। অথচ বাংলাদেশের বিদেশী দূতাবাসগুলোর অফিস এবং রাষ্ট্রদূতের বাসা গুলশানে। এটা একটা লজ্জা শরমেরও ব্যাপার। গুলশানের পরেই হচ্ছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাটা কুমিল্লা, সিলেট, রংপুর, বগুড়া ইত্যাদি পুরনো বৃহত্তম জেলা শহরগুলোর চেয়ে বড়। মনে হয় শাহ আলম সাহেব শুধু আবাসিক এলাকা গড়ে তোলেননি মশার চাষও করেছেন। তিনি তার এলাকায় মশা নিধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না কেন বুঝে আসে না।
উত্তর দক্ষিণের উভয় মেয়র এখন যুবা বয়সের লোক। আমরা মনে করেছিলাম উভয়ে কঠোর পরিশ্রম করে শহরটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলবেন। কিন্তু এ পর্যন্ত তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন চোখে পড়ে না। বড় বড় রাস্তাগুলোর মেরামত নিয়মিত হচ্ছে। কিন্তু অলি গলিগুলো দিয়ে কোনো ব্লাড প্রেসারের রোগী রিক্সায় করে যেতে পারে বলে মনে হয় না। যেন অলিগলিতে কোনো লোক থাকে না বা অলিগলির লোকেরা যেন খাজনা ট্যাক্স দেয় না!
আমাদের কলাম লেখকেরা কোনো কিছু লেখার আগে প্রথমে বন্দনা গীত সংযোজন করেন। এ যাবৎ কিছু কিছু লেখা পড়েছি যারা উভয় সিটি করপোরেশন সম্পর্কে লিখেছেন। বিরক্ত লাগে অর্ধেক লেখা মেয়র বন্দনা। মেয়রকে দায়মুক্ত করতে তারা তাদের লেখায় উঠে পড়ে লেগে যায়, আমলাদের দোষারোপ করতে। আমলারা সাধারণ মানুষের কাছে দায়বদ্ধ নয়। মেয়র আর কাউন্সিলররাই মানুষের কাছে দায়বদ্ধ। তারা আমলা-কর্মচারী সামাল দিতে না পারলে নেমে আসুক।
ঢোল পিটিয়ে দেখলাম দক্ষিণ সিটির লোকেরা মশার ওষুধ ছিটাচ্ছে আর সাধারণ লোকদের বলতে শুনলাম ধোঁয়াই সব এখানে কোনো ওষুধ নেই। এই কথায় সত্য মিথ্যা কতটুকু আছে জানি না। তবে সাধারণ মানুষের অনুরূপ ধারণা হবে কেন? ওষুধ নাকি সব কর্মচারীরা বিকিয়ে খায়। মেয়র সাহেবেরা করেন কি? কাউন্সিলার সাহেবেরা করেন কি?
মনিটরিং করার ব্যবস্থা না থাকলে অবস্থা তো অনুরূপ হবেই। ঘুষ নেয়া, সরকারী অর্থ-আত্মসাৎ করা এটা কোনো নতুন ব্যাপার নয়। প্রাচীনকালের চানক্য এ সব বিষয়ে তার পুস্তুকে আলোচনা করেছেন। সুতরাং এ নিয়ে হা-হুতাশ করে লাভ নেই। আমাদের দুঃখ ওইখানে যখন শুনি আগে নাকি ৮০ শতাংশ কাজ হতো বাকী ২০ শতাংশ নাকি আত্মসাৎ হতো এখন নাকি তার বিপরীত ২০ শতাংশ কাজ হয় ৮০ শতাংশই নাকি আত্মসাৎ। সম্ভবত এ কারণেই রডের কাজ বাঁশের পালা দিয়ে সারে।
তাই বলছি মেয়র হয়ে কেউ সুখ-শান্তি লাভ করবে এ কথা মিথ্যা। মেয়র যদি সফলতা লাভ করতে চায় তাকে চক্ষুকর্ণ খুলে রেখে দৌঁড়তে হবে। ইঞ্জিনিয়ার ইঞ্জিনিয়ারের কাজ করবে, ঠিকাদার ঠিকাদারের কাজ করবে, ঝাড়ুদার ঝাড়দারের কাজ করবে- তাদের সফলতা ব্যর্থতা সবই কিন্তু মেয়রের। সুতরাং মেয়রকে সব চেয়ে বেশী সক্রিয় থাকতে হবে।
শুনেছি ওয়াসাকে সিটি করপোরেশনের হাতে তুলে দিচ্ছে। ওয়াসা খুবই জরুরী সংস্থা। সমগ্র শহরের পানি সরবরাহ ও ময়লা নিষ্কাশনের দায়িত্ব তার। সত্য কথা অকপটে বলা ভালো। সিটি করপোরেশন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সংস্থা। কোন ভাবনায় সরকার ওয়াসাকে সিটি করপোরেশনের সাথে যুক্ত করতে চাচ্ছে জানি না।
আমার মনে হয় এতো জন দুর্ভোগ বাড়বে। সিটি করপোরেশনগুলো স্মার্ট সংস্থা নয়। সুতরাং তাদের বোঝা বাড়িয়ে লাভ হবে না। ওয়াসাকে কোনো জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংস্থার অধীনে দেওয়ার ভাবনা থেকে যদি সরকার এ কাজ করতে চান তবে পৃথকভাবে মনোনীত ব্যক্তি দিয়ে বোর্ড গঠনের মধ্যদিয়ে ওয়াসা আপাতত চালানোর প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়াই উত্তম হবে।
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী : কলামিস্ট এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close