সোমবার ২৩ অক্টোবর ২০১৭


চিকনগুনিয়ার মোটা ধাক্কা


সংবাদ সমগ্র - 18.07.2017

বিভুরঞ্জন সরকার : ঢাকা শহরে এখন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে আতঙ্কের নাম চিকনগুনিয়া। এটা একটি ব্যাধির নাম। আমার ৬৩ বছরের জীবনে রোগ-ব্যাধি কম হয়নি। চিকনগুনিয়ার মতো এমন যন্ত্রণাদায়ক বিদঘুটে ব্যাধি আর হয়নি। দ্বিতীয় রোজার দিন থেকে শুরু হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা এখনো আছে। প্রথম তিন সপ্তাহতো ঘর থেকে বের হতে পারিনি।
চিকিৎসকের কাছে গেলে বলেন, এ রোগের তেমন একটা চিকিৎসা নেই। প্যারাসিটামল ট্যাবলেটই ভরসা। তরল খাবার আর বিশ্রাম হলো চিকনগুনিয়ার প্রধান চিকৎসা। আমাকে আর একটু বেশি চিকিৎসা নিতে হয়েছে। বাড়িতে মেয়ে ডাক্তার হওয়ায় হাসপাতালে যেতে না হলেও বাসার বিছানাই হাসপাতালের বেডে পরিণত হয়েছিল। একটানা ৪/৫ দিন কোনো কিছু খেতে না পারায় এবং পানি খেলেও বমি হওয়ায় শেষে বাসায়ই স্যালাইন দিতে হয়েছে।


প্রচণ্ড ব্যথায় দাঁড়াতে না পারায় পাঁচ দিন ফিজিওথ্যারাপিও নিতে হয়েছে। ন্যাপ্রোক্সেন নামের একটি ব্যথা নাশক ট্যাবলেট খেয়ে এখন কোনোমতে চলাফেরা করছি। আমার বাসায় আমরা পরিবারে চারজন সদস্য। কেউ চিকনগুনিয়ার আক্রমণ থেকে রেহাই পাইনি। এজন্যই আমি বলি, নামে চিকন শব্দ থাকলেও এর ধাক্কা অনেক মোটা। জীবনযাপন প্রণালীই একেবারে তছনছ করে দেয়। কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, আমার ঘরের কথা এভাবে পরের কাছে বলা কেন?
চিকনগুনিয়া আসলে কোনোভাবেই একঘরের ব্যাপার নেই। এটা ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় সবক্ষেত্রেই পরিবারের সবাই আক্রান্ত হচ্ছেন। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই কেউ কেউ সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু স্বাভাবিক হতে পারছেন না। এই যে একটা লম্বা সময় ধরে মানুষ কর্মহীন থাকছেন, কষ্ট-যন্ত্রণা ভোগ করছেন– এটাকে কি কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা বলা যায়?
কিন্তু আমাদের মাথার উপর যারা বসে আছেন, যারা আমাদের ভালো-মন্দ দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে বসে আছেন তাদের কোনো হেলদোল নেই। বেশ বিলম্বে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোদাম্মদ নাসিম জাতীয় সংসদে জানালেন চিকনগুনিয়া নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
নাগরিকদের আশ্বস্ত করার সাথে সাথে মন্ত্রী মহোদয় এটাও বললেন যে চিকনগুনিয়া যেহেতু মশা বাহিত রোগ কাজেই এটা প্রতিরোধে তার মন্ত্রণালয়ের কোনো দায়িত্ব নেই। এর দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। মন্ত্রী বাহাদুর এই সুযোগে মিডিয়াকেও একটু সবক দিতে ভুললেন না। মিডিয়াকে আতঙ্ক না ছড়াতে উপদেশ দিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে বললেন।
আমাদের কর্তা ব্যক্তিদের নিয়ে এই হয়েছে একজ্বালা! ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন, কেষ্টা বেটাই চোর।’- এর মতো দেশে কিছু হলে এবং সেখানে সরকারের দায়িত্বহীনতা বা অবহেলার কোনো ব্যাপার থাকলেই মিডিয়ার ঘাড়ে গিয়ে দায় চাপবেই। আমাদের মিডিয়া ভুলভাল করে না তা নয়। সাংবাদিকদের মধ্যেও অসততা আছে। সাংবাদিকরাওতো এই সমাজেরই মানুষ। সমাজ যেখানে দুর্নীতিগ্রস্ত সেখানে শুধু সাংবাদিকদের কাছে শতভাগ সততার প্রত্যাশা কেন?
আমি দিনের পর দিন রোগে ভুগলাম এটা যদি আমি প্রকাশ করি, মিডিয়ায় তা বের হয়, তাহলে তাকে আতঙ্ক ছড়ানো বলা যাবে কি? যা ঘটেনি তাই যদি মিডিয়ায় বের হয় তাহলে মিডিয়াকে দোষারোপ করা যায়। কিন্তু চিকনগুনিয়ার ক্ষেত্রে তো তেমন কিছু ঘটেনি। যাক, এটা অবশ্য ভিন্ন আলোচনার বিষয়।
মন্ত্রী সিটি করপোরেশনের উপর দায় চাপানোর পর সিটিকর্তা আর চুপ থাকেন কি করে? ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক সাংবাদিকদের ডেকে বললেন, চিকনগুনিয়ার দায় সিটি করপোরেশনের নয়। ঘরে ঘরে গিয়ে তো আর মশা মারা সম্ভব নয়! কারো বিছানায় মশারিটা নিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন নিতে পারে না।
একেবারে খাঁটি কথা। মানুষের ঘরে ঢুকে মশা মারতে গিয়ে করপোরেশনের কর্মীরা আবার অন্য কেসে ফেঁসে যেতে পারেন, যেমন আ স ম আব্দুর রবের বাসায় বিনা দাওয়াতে ঢুকে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েছে উত্তরা থানার পুলিশ। বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আল্লাহর মাল আল্লায় নিছে বলে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিলেন। এবার মেয়র আনিসুল হয়তো তার রেকর্ড ভাঙবেন।
তাহলে এখন ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? চিকনগুনিয়ার মূল কারণ যেহেতু মশা, তাই চিকনগুনিয়ার দায় প্রধানত মশার ওপরই বর্তায়। এখন মশা মানুষের ওপর হামলে পড়েছে বলে মশার ওপর সিটি করপোরেশনতো আর হামলে পড়তে পারে না। মশার কাজ মশা করেছে, তাই বলে মশাকে তো আর কামড়ানো যায় না! তাছাড়া সিটি করপোরেশন বেশি তৎপরতা দেখালে যদি আবার বলা হয়, মশা মারতে কামান দাগা শুরু হয়েছে!
মশার পর চিকনগুনিয়ার দায় যাদের ওপর বর্তায় তারা হলো সেই নাদান পাবলিক যাদের এই রোগ হয়েছে। তারা রোগের কথাটা চেপে গেলেই তো মিডিয়া এটা ইস্যু তৈরি করতে পারতো না। একটু না হয় দুঃখ-কষ্ট হচ্ছিল। তাই বলে সেটা পাঁচ কান করতে হবে?
আপনার সব দুঃখ-কষ্টের কথা কি সবাইকে বলে বেড়ান? গোপন কত ব্যাধির কথাওতো মানুষ ডাক্তার ছাড়া কারো সাথে শেয়ার করে না। চিকনগুনিয়ার কথাটাও সেভাবে চেপে গেলেই তো এটা নিয়ে সরকার বা সিটি করপোরেশনকে বিব্রত হতে হতো না।
কথাগুলো হালকা চালে লিখছি বটে কিন্তু ভেতরে কাজ করছে প্রচণ্ড ক্ষোভ। এ কোন দেশে বাস করছি আমরা? দায়িত্ব এড়ানোর এমন নগ্ন প্রতিযোগিতা কোনো সভ্য সমাজে চলে কি? নাগরিকদের দুঃখ-দুর্ভোগ কমানোর কথা বলেইতো আপনারা বড়বড় পদ-পদবিধারী হয়েছেন। ভোটএলে আপনারা বিনয়ের অবতার, ভোট গেলে চোখের পাতা উল্টে যায়।
আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী না হয় রাজনীতির মানুষ, তাকে এদিক ওদিক করেই চলতে হয়। প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং ভঙ্গ করার মধ্যেই নাকি খাঁটি রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার পরীক্ষা হয়! কিন্তু মেয়র আনিসুল হকতো ট্র্যাডিশনাল রাজনীতিবিদ নন। তাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিক করেছেন নির্বাচিত গণ প্রতিনিধিদের সামনে একটি মডেল হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য।
কিন্তু মডেলের নমুনা খুব ভালো বলে মনে হচ্ছে কি? আনিসুল হককে যারা একজন রুচিশীল সহবত সম্পন্ন মানুষ বলে জানেন তারা কি মেয়র আনিসুল হকের কথা বার্তায় একটু সংবেনশীলতার অভাব লক্ষ করছেন না? রাজনীতির রোগ কি তাকেও পেয়ে বসলো?
এটা হয়তো ঠিক যে আমাদের নাগরিকদের বড় অংশের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। তারা যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলেন। বাসাবাড়িও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন না। মশার প্রজনন ক্ষেত্র তাই ঘরে ঘরে। প্রশ্ন হলো, নাগরিকদের সচেতন করার দায়িত্ব কার বা কাদের? নগর পালক আনিসুল হক কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে তার যারা অ্যাপারেটাস, সিটি করপোরেশনের সেই কর্মী দলের কতভাগ দায়িত্ব পালনে আন্তরিক ও সৎ?
কথায় আছে আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাও। সিটির ভাগ্য বিধাতারা যদি দায়িত্ব পালনে সচেতনতার প্রমাণ রাখতে পারতেন তাহলে নাগরিকরাও অন্তত চক্ষু লজ্জার কারণেও নাগরিক সচেতনতার পরিচয় দিতেন। নাগরিকদের কাছে ভোট নেবেন, ট্যাক্স নেবেন, তাদের কিছু দেবেন না?
সবচেয়ে বড় কথা, দোষারোপের পথটা পরিহার করতে হবে। একজন মানুষ নানা কারণে একটি কাজে অসফল হতে পারে। কিন্তু সেটা অকপটে স্বীকার করতে সমস্যা কোথায়? নিজমুখে নিজের অসফলতার কথা বললে মানুষ সেটা বরং ইতিবাচক ভাবেই নেবে। এবার অসফল হয়েছি কিন্তু ভবিষ্যতে হবো না। এই স্পিরিট মানুষ দেখতে চায় তাদের প্রতিনিধিদের মধ্যে।
সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের যে অভাব রয়েছে, সরকারি অর্থ, যা আসলে পাবলিক মানি, অপচয়ের যে প্রবণতা রয়েছে, উন্নয়ন কাজে লুটপাটের যে খেলা চলে তার লাগাম টেনে ধরে মানুষের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা না করলে এখন চিকনগুনিয়া যেমন নাগরিকদের ভোগাচ্ছে, ভোটের আগে তেমনি নাগরিকরাও আপনাদের ভোগাবে। বারবার তো আার বিতর্কিত নির্বাচন, কাউকে চেয়ারে বসিয়ে দেবে না।
চিকনগুনিয়ার মোটা ধাক্কার চেয়ে পাবলিকের ধাক্কার জ্বালা কিন্তু কোনো অংশেই কম নয়। কাজেই মশা মারার জন্য যা যা করা দরকার তা অবিলম্বে করুন। নগরীকে বাসোপযোগী করুন। পাবলিকের নাকের আগায় মুলো ঝুলিয়ে বেশিদূর এগুনো যাবে না।
বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
[email protected]




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close