বুধবার ১৮ অক্টোবর ২০১৭


সমকামীদের বিয়ে ও মূর্খতা


সংবাদ সমগ্র - 18.07.2017

জববার হোসেন : কখনও কখনও কোনও কোনও বিয়ের খবর লোকের নজর কাড়ে। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জাহেদ চৌধুরী ও রোগানের বিয়ের খবরটিও নজর কেড়েছে লোকের। দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে আমারও। জাহেদ-রোগানের বিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর। মিডিয়া খবরটি প্রচারও করছে ফলাও করে। দু’জনই পুরুষ। একজন মুসলিম, অন্যজন খৃষ্ট ধর্মের অনুসারী। সমকামী দু’জন।


প্রচলিত বিয়ের আদলেই অতিথি আমন্ত্রিত হয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছে। একজন সঙ্গী সারাজীবনের জন্য কাছে থাকার, পাশে পাবার যে আকুতি ও আনন্দ তাও ছিল চোখে মুখে তাদের। আর বাড়তি কৌতূহল ও আগ্রহ ছিল আমন্ত্রিতদের। লোকের আগ্রহের কারণ মূলত দু’টো। একটি সমকামিতা, অন্যটি মুসলিম সঙ্গীর অংশগ্রহণে এটিই প্রথম সমকামী বিয়ে বলে যুক্তরাজ্যের দাবি।
প্রায়ই সমকামীরা তাদের বিয়ের অধিকারে আওয়াজ তোলে। সোচ্চার হয়। দুনিয়ার অনেক দেশেই সমকামীদের বিয়ের বৈধতাও রযেছে। বছর খানেক আগে মার্কিন মুলুকে ওবামা সরকার সমকামীদের বিয়ের আইনি অধিকার দিলে এখানেও এসে লাগে সেই ঢেউ।
তথাকথিত প্রগতিশীলদের অনেকেই এই অধিকার আদায়কে বিশাল এক বিজয় বিবেচনা করে নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল বদলে ‘রেইনবো’করে। রেইনবো সমকামিতার প্রতীক।
মনে আছে, ব্লগার, কলামিস্ট আসিফ মহিউদ্দিন রেইনবো নিয়ে ভীষণ মাতামাতি শুরু করেছিল। যা ছিল ধর্মীয় অবমাননা এবং রীতিমত অশ্লীলতা তো বটেই। আসিফ মহিউদ্দিনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তখন লিখেছিলাম।
লিখেছিলাম সমকামীদের বিয়ের সমালোচনা করেও। উদার বলে, মুক্তচিন্তার মানুষ হলে দাবি করলেও, সমালোচনা নিতে পারে না এই সব ‘তথাকথিত প্রগতিশীলরা’। আমাকে তাদের ব্লকের অনেকেই গাল দিয়েছিল, আনফ্রেন্ড করেছিল।
আমি বরাবরই বিজ্ঞানমনষ্ক, যুক্তিপ্রবণ মানুষ। যুক্তিপ্রবণ বলেই হয়তো সমকামীদের বিয়ের বিষয়টিকে সমর্থন করতে পারি না। এ ক্ষেত্রেও জাহেদ-রোগানের তোলপাড় করা বিয়েকে সমর্থন করতে পারছি না বলে দুঃখিত।
জাহেদ-রোগান নয়, যে কেউ, যে কোন ব্যক্তি সে নারী বা পুরুষ, যদি সমকামী হয়ে থাকে তাহলে তার প্রচলিত বিবাহ কাঠামোর প্রক্রিয়াতে যাওয়ার বিষয়টিতেই এক ধরনের দর্শনগত ত্রুটি রয়েছে বলে মনে করি। আমার অনেককালের যৌনতা বিষয়ে লেখাপড়া, গবেষণা, কাজে অন্তত তাই মনে হয়।
বিবাহ একটি প্রচলিত সামাজিক ও আইনি কাঠামো, সম্পর্কের। সেটি মূলত নারী ও পুরুষের মধ্যে এক ধরনের চুক্তি সম্পাদন, যা একই সঙ্গে ধর্মীয় বিধানকে মেনে নেয়া। সমকামিতার অস্তিত্ব থাকলেও কোন ধর্ম তা অনুমোদন করে না। অনেক সমাজেও তা অগ্রহণযোগ্য। যে বিবাহ কাঠামো ‘নারী-পুরুষ’সম্পর্কের ধারণায় প্রতিষ্ঠিত, সামাজিক, ধর্মীয়, সেই কাঠামোতে সমকামীদের যেতে হবে কেন?‘
প্রথম কোন মুসলিমের সমকামী বিয়ে’- টেলিগ্রাফ পত্রিকার এমন মন্তব্যেও খুব অবাক হয়েছি। ইসলাম কোনভাবেই সমকামিতাকে সমর্থন, অনুমোদন করে না, কেউ যদি সমকামী হিসেবে নিজেকে দাবি করে, মনে করে নিজেকে সমকামী, তাহলে সে নিজেকে মুসলিম ভাবে কি করে?
জাহেদ আসলে রুপান্তরকামী, খবরের কাগজে তার সম্পর্কে পড়ে তাই মনে হয়েছে আমার। কেননা, একসময় সে জেন্ডার ট্রান্সফারের চেষ্টাও করেছিল। নিজেকে ভাবছে ‘স্ত্রী’, আর রোগানকে তার স্বামী। স্বামী-স্ত্রীর সংসার, দাম্পত্য যা হয় ট্রেডিশনালি।
দর্শন ও আদর্শগত জায়গা থেকে সমকামিতায় কোন স্বামী-স্ত্রী’র স্থান নেই। প্রেমিক-প্রেমিকা কনসেপ্টের সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে, ‘সম’ সকল অর্থেই সম। একজন পুরুষ, অন্য পুরুষকে নারী ভেবে ভালোবাসে না, আকর্ষণবোধ করে না, প্রেমটি বোধ করে পুরুষ বলেই। নারীর ক্ষেত্রেও তাই, কবি স্যাফো, নিজে নারী হয়েও অন্য নারীর প্রেমে পড়েছিলেন। কবিতা লিখেছিলেন নারীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে।
ইতালীর লেসবোস দ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন স্যাফো, যার নাম থেকেই পরবর্তীতে মেয়েদের ‘লেসবিয়ান’শব্দটি এসেছে। সেদিক থেকে বিচার করলে সমকামীদের বিয়ে নেহাত মূর্খতা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
আমরা যুক্তির চেয়ে আবেগ আশ্রয়ী। নিজের মতের চেয়ে অন্যের মতে প্রভাবিত হই বেশি। সহজেই দলে বিভক্ত হই। দাঁড়াতে পারি না, নিজস্ব চিন্তায়। আমি বরাবরই যুক্তিপ্রবণ। আমার কোন দল নেই, পরিষদ নেই। তালি দেবার, গালি দেবার নির্মিত সিন্ডিকেট নেই। নিজস্ব যুক্তিপ্রবণতায়, বিজ্ঞান চিন্তায় বলতে ভালোবাসি।
সেদিক থেকে, সেসব চিন্তা থেকে সমকামীদের বিবাহের কোন অর্থ খুঁজে পাই না আমি। জাহেদ-রোগানের বিয়ে তাই আমার কাছে নেহাত মূর্খতার শামিল।
জববার হোসেন : সম্পাদক, আজ সারাবেলা। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মিডিয়াওয়াচ। পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন। সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র।
[email protected]




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close