মঙ্গলবার ২২ অগাস্ট ২০১৭
  • প্রচ্ছদ » Box 1 » মসুল থেকে আইএস উৎখাতের ফল ও তার পরিণতি


মসুল থেকে আইএস উৎখাতের ফল ও তার পরিণতি


সংবাদ সমগ্র - 12.07.2017

মে. জে. মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.) : ২০১৪ সালের জুন মাসে কথিত খেলাফত ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল দখল করে নেয় আইএস বাহিনী। দোজলা ফোরাত বিধৌত ইরাকের প্রাচীন সভ্যতার ধারক মসুল নগরীতে যুদ্ধের আগে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বসবাস করতেন। যার মধ্যে অর্ধেক মানুষ জীবন ভয়ে পালিয়ে এসে বাস্তুচ্যুত ক্যাম্পে অবস্থান করছেন। শুরু থেকেই আইএস বাহিনী বেসামরিক নাগরিকদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহারের কৌশল নেয়। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর গত ১০ জুুলাই রোববার ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মুনসুর আল আবাদি সামরিক বাহিনীর কালো পোশাক পরে খোদ মসুল শহরে হাজির হন এবং উৎফুল্ল চিত্তে আইএসের বিরুদ্ধে নিজ বাহিনীর বিশাল বিজয়ের ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গে খবরটি সঙ্গত কারণেই সারাবিশ্বের মিডিয়ায় ব্রেকিং নিউজ হয় এবং হেডলাইনে চলে আসে।


মনসুর আল আবাদি ঘোষণা করেন, তথাকথিত আইএস খেলাফতের পতন ও কবর রচিত হলো মসুলে, তারা আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। যদিও শহরের আনাচে কানাচে বিক্ষিপ্তভাবে ছোট ছোট পকেট আকারে আইএসের কিছু বিচ্ছিন্ন অংশ তখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে বেশিদিন তারা আর টিকে থাকতে পারবে না, মসুলে তাদের দিন শেষ। মসুলে অর্জিত বিজয়ের মনোবল ও আত্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ইরাকের জাতীয় সেনাবাহিনী অন্যান্য এলাকায় ছোট ছোট শহর ও গ্রামভিত্তিক অবশিষ্ট আইএস ঘাঁটিগুলোকেও পরাস্ত করতে সক্ষম হবে। সেটা হলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো ইরাকে আইএসের ভূ-খ-গত মালিকানার অবসান ঘটবে। তারপর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন ফোর্স আইএসের কথিত রাজধানী সিরিয়ার রাক্কায় সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে তাতে অল্প কয়েক মাসের মধ্যে রাক্কা থেকেও আইএস উৎখাত হবে। তাদের তথাকথিত খেলাফতের ভূ-খ-গত কোনো অস্তিত্ব আর থাকবে না। তাদের অর্থের উৎস বন্ধ এবং সাংগঠিক নেটওয়ার্ক ভেঙে যাবে। বিশ্বব্যাপী জঙ্গিয়ায়নে উদ্বুদ্ধ (জধফরপধষরুধঃরড়হ) হওয়ার জন্য সারিবাদি সালসা নামক টনিক আইএসের পতনের ফলে বিপদগামী তরুণদের মন থেকে অতিরিক্ত রোমাঞ্চ ও অ্যাডভেনচারিজমের উত্তেজনাও উবে যাবে। তথাকথিত খেলাফত বিলুপ্ত হলে আইএস দুর্বল হবে ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সিরিয়া, ইরাক অথবা বিশ্ব আইএস নামক দানবের হুমকির কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে গেল। তারা নিশ্চয় বিকল্প পথের সন্ধান করবে। জঙ্গি সন্ত্রাসের মূল উৎস ওয়াহাবিবাদের সালাফিতন্ত্রের উগ্র জিহাদি তত্ত্বের বিনাশ না পর্যন্ত এর থেকে মুক্তি নেই। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক যারা আইএস বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, এদের মধ্যে যারা বেঁচে আছে তাদের একাংশ বাংলাদেশে ফিরে আসার একটা চেষ্টা করতে পারে। এজন্যে এখনই কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যেমনÑ এক. আমাদের সমস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরের জন্য বিশেষ সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করা, যাতে সেখানে কর্মরত ইমিগ্রেশন বিভাগ ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যগণ, তারা কেউ এলে যেন বিশেষ পন্থায় তাদেরকে চিহ্নিত এবং ওইখানেই গ্রেফতার করতে পারে। দুই. মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের সমস্ত দেশে আমাদের দূতাবাসগুলোকে সতর্ক করা, যাতে ছদ্মনামে বা কারসাজির মাধ্যমে নতুন পাসপোর্ট বা নতুন কোনো ট্রাভেল ডকুমেন্টস তারা যেন তৈরি করতে না পারে। তিন. বৈধ পথে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধাগ্রস্ত হলে তারা মানবপাচার চক্রের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশের যেকোনো সীমান্ত দিয়ে গোপনে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। তাই ভারতের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্ত সীমান্ত জুড়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন এবং গোয়েন্দা নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করা দরকার। সীমান্তে চোরাচালানিদের সহায়তাও তারা নিতে পারে। চার. যারা বহুদিন যাবত নিখোঁজ ও পলাতক আছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের সংযোগ স্থল এবং আশ্রয় প্রশ্রয়ের জায়গাগুলোর ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে।
এ কথা আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির খেলার মধ্যদিয়ে আইএস-আল কায়েদার জন্ম হয়েছে এবং সেই খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো দেশই জঙ্গি সন্ত্রাসীদের হুমকি থেকে পরিপূর্ণ মুক্ত হতে পারবে না।
লেখক: কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close