বুধবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭


ঘরেতে মশা এলো চিকনগুনিয়ে


সংবাদ সমগ্র - 12.07.2017

প্রভাষ আমিন : গান আমার খুব প্রিয়। আফসোস গাইতে পারি না। কলেজে থাকতে একবার গান শেখার চেষ্টা করেছিলাম। কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমির ওস্তাদ দুদিনেই বুঝে গিয়েছিলেন, আমার মধ্যে অসুর থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু সুরের কোনো বালাই নেই। তারপর গান ফেলে তবলা ও গিটার শেখার চেষ্টা করেছি। কিছুতেই সুরের দেবীকে পোষ মানাতে পারিনি। তবে সুরকে ধারণ করেছি অন্তরে। গাইতে না পারলেও গান শুনি অনেক। সুখের দিনে শুনি, দুঃখের দিনে শুনি।
আর গাইতে না পারার দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে সারাক্ষণ গুন গুন করি। মাঝে মাঝে এমন হয়, কোনো একটা গান ভাঙ্গা রেকর্ডের মত আটকে যায় মাথায়। সারাক্ষণ সেটার গুন গুন চলতেই থাকে। এখন যেমন মাখায় আটকে আছে, ‘ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে …।’
কিন্তু সমস্যা হলো গাইতে গেলেই কথাগুলো নিজে নিজে পাল্টে যাচ্ছে, ‘ঘরেতে মশা এলো চিকনগুনিয়ে …।’


আসলে আমাদের সকলের শয়নে-স্বপনে-জাগরণে এখন মোটা অসুখ চিকনগুনিয়া আর ছোট্ট পতঙ্গ মশা। মশাই এখন এই শহরের সবচেয়ে বড় মাস্তান। টিভিতে কোনো একটা মশার কয়েলের বিজ্ঞাপনে পুলিশ অফিসার বাবা ছেলের কাছে বাহাদুরী দেখাতে বলে, ‘জানিস, এই শহরের সব বড় বড় মাস্তানরা তোর বাবাকে ভয় পায়।’ ছেলে পাল্টা
বলে, ‘বাবা মশারা তোমাকে ভয় পায় না কেন?’ এক প্রশ্নেই কাবু মহাপরাক্রমশালী পুলিশ অফিসার। আসলেই মশার চেয়ে বড় মাস্তান আর কেউ নেই। ‘মাক্ষি’ নামে একটা হিন্দি সিনেমায় দেখেছিলাম একটা মাছি কিভাবে একজন মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলতে পারে। মাছির জায়গায় মশা বসিয়ে ছবিটি বাংলাদেশে পুনর্নির্মাণ করলে সুপারহিট হবে। মশা এখন এক আতঙ্কের নাম। বিএনপি ঈদের আগে-পরে কোনো আন্দোলনেই সরকারের গায়ে আচড় কাটতে পারেনি।
কিন্তু এই ছোট্ট এডিস মশা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দাপুটে দুই মেয়র, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, এমনকি সরকারকেও কাঁপিয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ তো প্রতিদিনই চিকনগুনিয়ায় কাঁপছে।
মশা নিয়ে আমি বহুমুখী সমস্যায় আছি। চিকনগুনিয়া তো পরে। এমনিতে আমি গান শুনতে পছন্দ করি বটে, তবে কানের কাছে মশার চিকনসঙ্গীত আমাকে ঘুমাতে দেয় না। আবার মশারী দিলেও ঘুমাতে পারি না, নিজেকে বন্দী বন্দী লাগে। মশার কয়েলের ধোঁয়ায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তবে এখন এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই।
মুক্তি কাল দোকানে গিয়ে মশার কয়েল, ম্যাট, লিকুইড, অ্যারোসল- মশা মারতে যা যা লাগে সব নিয়ে এসেছে। মশার বিরুদ্ধে চতুর্মুখী আক্রমণ চলবে। পেলে বোধহয় একটা কামানও নিয়ে আসতো। মুক্তির এতটা ভয় পাওয়ার কারণ আছে। ইকবাল রোডে যে ৬ তলা ভবনে আমরা থাকি, আমাদের বাসা ছাড়া বাকি সব বাসায় চিকনগুনিয়া চিকন সুঁই হয়ে ঢুকে এখন বিশাল ফাল হয়ে সবাইকে শুইয়ে দিয়েছে।
আমরা কিছুদিন দেশের বাইরে ছিলাম বলে, এখনও চিকনগুনিয়া থেকে বেঁচে আছি। আমার বাসার পাশেই কেয়ার হাসপাতাল। ভাড়া নেয়ার সময় পাশেই হাসপাতাল দেখে খুশি হয়েছিলাম, যাক বিপদে আপদে কাজে লাগবে। কিন্তু কেয়ার হাসপাতাল কোনো কাজেই লাগেনি। এখানে ২৪ ঘণ্টার একটি ফার্মেসি আছে। কিন্তু কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না।
আমার ধারণা ওষুধ থাকলেও তারা না বলে। কারণ খুব কমন কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ কেয়ারে পাবো ভেবে লাজ ফার্মা ফেলে এসে শুনি নেই, তখন মধ্যরাতে আবার ওষুধ কিনতে ছুটতে হয়। সেই কেয়ার হাসপাতাল এখন আমাদের দুঃখ।
কেয়ার হাসপাতাল আর আমাদের বাসার মাঝের খালি জায়গাটি যেন হাসপাতালের ডাস্টবিন। মেডিকেল বর্জ্য তো আছেই, সব এসির গরম হাওয়া, আর পানি নিস্কাশনের লাইনও এদিকেই। কেয়ার হাসপাতালের দিকের বারান্দায় গাছ বাঁচে না। সেদিক দিয়ে শুধু মশা আসে। মাঝে মধ্যে তারা জায়গাটি পরিস্কার করেন বটে। কিন্তু জমে থাকা পরিস্কার পানিতেই বংশবিস্তার করে এডিস মশা।
এই এডিস মশা একসময় দেশ কাঁপিয়েছে ডেঙ্গু দিয়ে। এবার কাঁপাচ্ছে চিকনগুনিয়া দিয়ে। জ্বরের নাম চিকন হলেও এর যন্ত্রণা মোটা। অন্য জ্বরের মত চিকনগুনিয়ার জ্বরও ৫/৭ দিনেই ছেড়ে যায়। তবে ছাড়ে ছাড়ে বলেও ছাড়ে না। দেড় থেকে দুমাস ধরে ভুগছেন, এমন রোগীও আছেন। জ্বর ছাড়ে বটে, তবে চিকনগুনিয়া ছাড়ে না।
চিকনগুনিয়া মানুষকে সত্যিকার অর্থেই কাবু করে ফেলে। কাঁপাকাঁপি জ্বর তো আছেই, আছে গিরায় গিরায় ব্যথা এবং জীবনীশক্তি কেড়ে নেয়া। তবে চিকনগুনিয়া যেন এখন সোশ্যাল স্ট্যাটাস হয়ে গেছে। ফেসবুকে সবাই যেভাবে চিকনগুনিয়া নিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছে, তাতে চিকনগুনিয়া না হওয়াটাই যেন সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা।
ঢাকার দুই মেয়র নানা কাজ করে মানুষের এক ধরনের আস্থা অর্জন করেছিলেন।
কিন্তু এবার বর্ষা এসে তাদের সব অর্জন ভাসিয়ে নিতে বসেছে। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি আটকে যা তা অবস্থা। রাস্তার বৃষ্টির পানি সরে গেলেও ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের কৌটা, ফুলের টবে পানি আটকে থাকে। আর সেই পরিস্কার পানিতেই বংশবিস্তার করে এডিস মশা। আর এডিসের হুলেই ছড়ায় চিকনগুনিয়া।
চিকনগুনিয়া দুই মেয়রকেই কাবু করে ফেলেছে। তাদের সব অর্জন সত্যি সত্যি ডাবের খোসায় জমে থাকা পানিতে ডুবে যাচ্ছে। মশা মারতে বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা কই গেল, প্রশ্ন উঠছে তা নিয়েও। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য চিকনগুনিয়ার দায় নিতে রাজি নয়। তাদের দাবি, মশা মারার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।
কেউ চিকনগুনিয়া আক্রান্ত হলেই কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। তার মানে চিকগুনিয়া হওয়ার আগ পর্যন্ত আপনি সিটি করপোরেশনের অধীনে, হওয়ার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। চিকনগুনিয়া মহামারী কিনা তা নিয়েও চলছে কথার লড়াই। যেন মহামারী বললে সরকারের বিশাল বিপদ হবে।
ঢাকার কত মানুষ চিকগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। কোনো পত্রিকায় লেখা হয়েছে ১১ জনে একজন, কোনো পত্রিকায় লেখা হয়েছে ৭ জনে একজন। আর ঈদের সময় লাখ লাখ মানুষ গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সারাদেশে চিকনগুনিয়া ছড়িয়ে দিয়েছে।
এখন চিকনগুনিয়া নিয়ে দেশজুড়ে হাহাকার। তবে চিকনগুনিয়া হঠাৎ করে আসেনি। গত ডিসেম্বরে প্রথম দেশে চিকনগুনিয়ার রোগী পাওয়া গিয়েছিল। তখন যদি সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঘুম ভাঙতো, তাহলে হয়তো এখন পারস্পরিক দোষারোপ করে সময় নষ্ট করতে হতো না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীও এখন চিকনগুনিয়ার জন্য মেয়রদের দায়ী করেছেন। আর গণমাধ্যমের প্রতি আহবান জানিয়েছেন, চিকনগুনিয়া নিয়ে অহেতুক আতঙ্ক না ছড়াতে। কিন্তু মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিডিয়া অহেতুক আতঙ্ক ছড়াচ্ছে না।গণমাধ্যম যথাযথভাবেই জনগণকে সতর্ক করছে। এটা আরো আগেই সরকারের করা উচিত ছিল। সরকারের কাজটা গণমাধ্যম করে দিচ্ছে শুধু।
সময় অনেক গড়িয়ে গেছে। চিকনগুনিয়া থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানানো হযেছে। কিন্তু চারদিক নোংরা রেখে, মশার বংশবিস্তারের সব উপায় খোলা রেখে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানিয়ে লাভ নেই। সিটি করপোরেশন বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলে তো আর আমাদের চলবে না।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে, মশা থেকে দূরে থাকতে হবে। নিজের চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কোথাও যেন পানি জমতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি। আর তেমনটা করা হলেই হয়তো আমরা চিকনগুনিয়ার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারি।
প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ।
[email protected]




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close