বুধবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭


৫৭ ধারা ও আইনমন্ত্রীর আশ্বাস


সংবাদ সমগ্র - 08.07.2017

দীপু সারোয়ার : গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্নীতির সংবাদ ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ‘বিতর্কিত’ ৫৭ ধারায় হওয়া মামলার আসামি হয়েছেন দৈনিক সকালের খবরের সিনিয়র রিপোর্টার আজমল হক হেলাল। ৬ জুলাই পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানায় মামলাটি হয়। এই মামলায় হেলালকে নিশ্চিতভাবেই জেলে যেতে হবে। মামলার ধারাই এমন, অজামিনযোগ্য।


সম্প্রতি ‘স্বাধীন বাংলা ডটকম’ ও ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ নামে দু’টি গণমাধ্যমে পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজীর বিরুদ্ধে ৩০ কোটি টাকার কাজ না করে বিল উত্তোলন সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন ফেসবুকে শেয়ার করেন আজমল হক হেলাল।
মামলার বাদী মঠবাড়িয়ার ডা. রুস্তম আলী ফরাজী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ফারুক হোসেন ‘স্বাধীন বাংলা ডটকম’ ও ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা না করে হেলালকে অভিযুক্ত করে এক অদ্ভুত দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। যা সচরাচর দেখা যায় না।
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় হওয়া মামলার কারণে আজমল হক হেলালের মতো আরও অনেক সাংবাদিকই এখন জেলে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। গত ৩ জুলাই ফেসবুকে মন্তব্য করায় যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার নাজমুল হোসেনসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে আইসিটি-৫৭ ধারায় মামলা হয় দিনাজপুরের কোতয়ালি থানা।
একই দিন সমকাল পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদন তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। তবে মামলাটি প্রত্যাহার করা হতে পার-এমন সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে।
গত ১১ জুন ‘একটি অসুস্থ শিশু, বিচারকের ট্রাক ও একটি মামলা…’ শিরোনামে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ওই সংবাদ প্রকাশের দু’দিন পর মানিকগঞ্জের জ্যেষ্ঠ সহকারি জজ মোহাম্মদ মাহবুবুর রাহমান তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় প্রতিবেদক গোলাম মুজতবা ধ্রুব’র বিরুদ্ধে মানিকগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেন। তারও আদালতে জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
৫৭ ধারায় হওয়া মামলায় ইতোমধ্যেই অনেক সাংবাদিক কারাভোগ করেছেন। তাদের মাথার উপর এখনও মামলা ঝুলছে। অনিশ্চয়তা আর ভয় নিয়েই কাজ করছেন তারা। যদিও এই ভয় বা উদ্বেগ নিরসন করা সরকারের জন্য কঠিন কোন কাজ নয়।
ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানায় আইসিটি আইনের ৫৭ (২) ধারায় দায়ের হওয়া মামলায় ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট ঢাকায় গ্রেপ্তার হন সাংবাদিক প্রবীর শিকদার। দৈনিক বাংলা ৭১, উত্তরাধিকার-৭১ নিউজ অনলাইন পত্রিকা ও উত্তরাধিকার নামের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক তিনি। ওই বছরের ১৯ আগস্ট জামিনে মুক্ত হন তিনি।
ফরিদপুরের এক রাজাকারকে নিয়ে প্রতিবেদন লেখায় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা এই সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। স্বাধীন দেশে কেন তিনি কারাভোগ করবেন, হাতকড়া হাতে নিয়ে আদালতে দাঁড়াবেন তার উত্তর জানা নেই আমাদের।
গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার হন শিক্ষাবিষয়ক অনলাইন পোর্টাল দৈনিক শিক্ষার সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান খান। ৬ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হলেও সিদ্দিকুরের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার নিষ্পত্তি হয়নি এখনও। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করার কারণে ২৯ আগস্ট মামলা হয় তার বিরুদ্ধে।
অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘নতুন সময়’-এ চলতি বছরের ২৩ ও ২৪ এপ্রিল নতুন সময়-এ ‘ওয়ালটন মোবাইল ক্রেতাদের গলার কাটা’ এবং ‘ওয়ালটন মোবাইলের ভোগান্তি, ক্ষোভে উত্তাল ফেসবুক’ শিরোনামে দু’টি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।
প্রতিবেদন দু’টি প্রকাশ করায় ‘নতুন সময়’ এর নির্বাহী সম্পাদক আহমেদ রাজুর বিরুদ্ধে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় ২৯ এপ্রিল রাজধানীর রমনা থানায় মামলা করে ওয়ালটন গ্রুপ। ৩০ এপ্রিল গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয় তাকে। পরে ৩ মে জামিনে মুক্ত হয় আহমেদ রাজু।
গত ৩০ মার্চ আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় কুষ্টিয়ায় স্থানীয় সাংবাদিক হাসান আলী ও আসলাম আলীর বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা হয়। ওই মামলায় ৯ মে গ্রেপ্তার হন তারা। আর জামিন পান ২৯ মে।
২০০৬ সালের আইসিটি আইনের বিধিমালায় ৫৭ ধারার অপব্যবহার হওয়ার আশংকা শুরু থেকেই করছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। এমন আশংকার মধ্যেই বেশকিছু সংশোধনী এনে ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর সংসদে আইসিটি আইনটি গ্রহণ করা হয়। সংশোধিত এ আইনে পুলিশকে সরাসরি মামলা করার ও পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
আইসিটি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৭ ও ৬১ ধারায় উল্লেখ করা অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য উল্লেখ করে সর্বনিম্ন ৭ বছর ও সর্বোচ্চ শাস্তির মেয়াদ ১০ বছর থেকে ১৪ বছর করা হয়েছে।
উল্লিখিত ধারাগুলোর মধ্যে গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্বেগ মূলত ৫৭ ধারা নিয়ে। এই ধারায় বলা হয়েছে-
০১.
কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্ক্ষলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরণের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।
০২.
কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বছর এবং অন্যূন সাত বৎসর এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দন্ডিত হইবেন।
প্রশ্ন হলো-কারো স্বার্থে ব্যঘাত ঘটলেই সত্য-অসত্য অনুসন্ধান বা তদন্ত না করেই শুধু মামলার ভিত্তিতে সাংবাদিকদের জেলে নেওয়া হলে ন্যায় বিচার কতটুকু প্রতিষ্ঠা হবে। যদি তা না হয় তাহলে যত দ্রুত সম্ভব আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল করে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
চলতি বছরের ২ মার্চ জাতীয় শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ‘বিতর্কিত’ ৫৭ ধারা বাদ দেয়ার আশ্বাস দেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। বাক স্বাধীনতা হরণের কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই বলেও ওই অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন তিনি।
আইসিটি আইনের বিরোধীতা করে অনেক আগে থেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। এই উদ্বেগ দূর করতেই মূলত সেদিন আইনমন্ত্রী ওই আশ্বাস দেন এবং মন্তব্য করেন। কিন্তু ওই আশ্বাস এখনও বাস্তবে পরিণত হয়নি।
তবে এই বিতর্কিত ৫৭ ধারার বিষয়ে রোববার আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি সভা অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। সেখানে ২১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতামত নেবে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ। ওই সভায় আইনমন্ত্রী ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন-এই আশা গণমাধ্যম কর্মীদের।
দীপু সারোয়ার : সাংবাদিক, কলাম লেখক; বিশেষ প্রতিনিধি, একুশে টেলিভিশন।
[email protected]




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close