বুধবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭


দেশী উদ্যোগে বিদেশী পরামর্শ


সংবাদ সমগ্র - 08.07.2017

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : বিদ্যমান মূল্য সংযাজন কর (মূসক) আইন নতুন করে প্রণয়ন ও প্রবর্তনে ব্যবসায়ীরা নানা দাবি পেশ করেই চলেছেন। ১৯৯১ সালের মূসক আইন যা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান আছে সময়ের অবসরে, দেশের ব্যবসায় বাণিজ্য আর্থিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তার প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়ন যোগ্যতার আলোকে সংস্কারের যৌক্তিকতা ও দাবি অনেক দিনের।

সে পরিপ্রেক্ষিতেই ২০১৫ সালে প্রবর্তন ও প্রয়োগযোগ্য ঘোষণা করে ২০১২ সালে সরকার সংশোধিত মূসক আইন নীতিগতভাবে অনুমোদন করে। এই অবসরে সবাইকে অনলাইনে ও নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা, আইনটির খুঁটিনাটি দিক পর্যালোচনা এবং সবার মতামতের ভিত্তিতে পরিবর্ধন পরিমার্জন করে যথাসময়ে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রবর্তিত হওয়ার কথা। কিন্তু ২০১৫, ২০১৬ গেল, এবার এখনো মত অমত চলছে। এফবিসিসিআই আইনটি প্রণয়নের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই বিভিন্ন কমিটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এখন প্রান্তিক পর্যায়ে এসে তারা বলেছেন নতুন আইনটি আসলে পুরাতন বা বিদ্যমান আইনের পুরোপুরি প্রতিস্থাপন অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ নতুন অবয়বে নতুন আইন হিসেবেই প্রবর্তিত হতে যাচ্ছেÑ তারা মনে করেন পুরাতন বা বিদ্যমান আইনটি যেহেতু এতদিন চালু ছিল, দেশের ব্যবসায় বাণিজ্য ব্যবস্থার সাথে তার একটা সংশ্রব বা বাস্তবায়নযোগ্যতা জন্মেছে, সেখানে শুধু বর্জনীয় বিষয় বাদ দিয়ে নতুন নতুন ধারা (অভিজ্ঞতার আলোকে) সংযোজিত হতে পারে। কিন্তু পুরো আইনটি যদি খোলনলচে পাল্টিয়ে প্রবর্তিত হয় তাহলে তা বাস্তবায়ন পুনরায় নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বিষয়টি উভয় পক্ষ থেকে খোলাসা করা অর্থাৎ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে স্পষ্ট করা আইনটি সত্যিই পূর্ণমাত্রায় নতুন কি না এবং এফবিসিসিআই থেকে দেখানো দরকার কিভাবে এবং কোথায় এটির মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি ও আপত্তি যেমন যথাগুরুত্বের সাথে নেয়া উচিত, তেমনি আইনটি যথাসময়ে প্রবর্তনের ব্যাপারে বাস্তবায়নযোগ্যতার বিচার বিশ্লেষণও জরুরি।
আরেকটি বিষয়। প্রায় তিন বছর হতে চলল নিরীক্ষা ও হিসাব পেশা ও পদ্ধতির তথা নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের জন্য একটি উপরিদর্শন প্রতিষ্ঠান (এফআরসি) এবং এর জন্য আইন (এফআরএ) প্রণীত হয়ে বসে আছে প্রবর্তনের পথে। এটি অবশ্য প্রশান্তিদায়ক যে আর্থিক প্রতিবেদন প্রণয়ন ও উপযুক্ত হিসাব নিরীক্ষণ তথা স্বচ্ছতা জবাবদিহি পরিবেশ রচনার জন্য, তা পাওয়ার জন্য গণসচেতনতা, আগ্রহ ও আকাক্সক্ষা ছিল বা আছে। কিন্তু এফআরএ এফআরসি নিয়ে সৃজিত বিতর্ক এবং বহুপক্ষীয় কৌশলগত মন্তব্য চালাচালির মধ্যে লক্ষণীয় থেকে যায়, পর্যালোচনাযোগ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, শ্রীমান এফআরসি গঠন ও কার্যকর করা নিয়ে কেন এই বিলম্ব?
উভয় ক্ষেত্রে যে জিনিসটি কমন হিসেবে উঠে আসে সেটি হলো দাতা সংস্থার শর্তে ও বিদেশী পরামর্শকের মোসাবিদায় আইন তৈরি হওয়ায় আইনের চেহারা চারিত্র ও ভাবদর্শন নিয়ে মতান্তর ঘটছে। সোজা কথায় বালসুলভ এ প্রশ্ন উঠছে যে, ‘হাঁটব আমি বাংলাদেশের রাস্তায়, মাথায় কেন ব্রিটিশ ট্রাফিক আইন?’ বিদেশী পরামর্শে দেশী উদ্যোগের বাস্তবায়ন যে বাস্তবতার আশপাশে ঘোরাফেরা করে এটা বোঝার তাগাদা দিচ্ছে এসব বিষয়। ১৯৯১ সালে ভূতপূর্ব ‘বিক্রয় কর’-এর স্থলে এবং অনেক দেশে প্রচলিত ‘গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স’ (জিএসটি) এর আদলে ‘ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স’ (ভ্যাট) ওরফে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) প্রবর্তিত হয়েছিল। সে সময় নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম বছরেই এই আইন প্রবর্তনের সময় বেশ বিতর্ক, অনিচ্ছা অনীহা ইত্যাদি উচ্চারিত হয়েছিল; কিন্তু সময়ের পরিসরে দেখা গেল সাফল্য নিয়ে? আইনটি টিকে গেছে। পাশের দেশে বাংলাদেশের ভ্যাট আইনের প্রশংসা মিলেছে। তবে সব সময় যা হয়ে থাকে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এর অনেক ধারা পরিবর্তন পরিমার্জনের মধ্যে পড়ে। প্রতিবছরের ‘অর্থ বিল’-এ তা প্রস্তাব করাও হয়েছে, গৃহীত হয়ে আসছে। মূসক আইনের সংস্কারের বিদেশী পরামর্শ ও শর্ত অনেক দিনের। এ জাতীয় কাজে বিদেশী পরামর্শকের কর্মসংস্থান হয় ভালো। ২০০৭-০৮ সালে সেই পরামর্শ ও দাবির মোকাবেলায় বলা হয়েছিল দেশীয় আইন দেশীয় সংস্কৃতি ও বাস্তবতার আলোকে দেশীয়ভাবে নিয়মিত সংস্কার করা হবে। বিদেশী পরামর্শকের মোসাবিদায় দেশীয় আইনের চেহারা চারিত্র অনেক পাল্টিয়ে যায়। কেননা, বিভিন্ন উন্নত অর্থনীতির ‘বেস্ট প্র্যাকটিস’গুলো ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ করে প্রণীত গুরুপাক আইন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে হজমযোগ্য হয় না বলেই তা বাস্তবায়নে নানা দুর্বিপাক সৃষ্টি হয়, উদ্ভব হয় বিভিন্ন সমস্যার। এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বহু আইন তৈরি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘটেছে। বিদেশী পরামর্শে ও শর্তে বাংলাদেশে বহু প্রতিষ্ঠান ভাঙা গড়া হয়েছে। আবার বানানো ভবন ভেঙে পূর্বের অবস্থায় ফেরত যেতে হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সংসার ভেঙে খান খান হয়েছে বারবার। দেশী-বিদেশী শিল্প উদ্যোগ নিয়ন্ত্রণের নামে এন্তার পোষক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ইকোনমিক জোন বংশে ইদানীং নতুন প্রজন্মের ছড়াছড়ি। নিরীক্ষা ও হিসাব ব্যবস্থা উন্নয়ন ও স্বচ্ছতার সাথে আর্থিক প্রতিবেদন প্রণয়নের স্বার্থে ‘এফআরএ’র আওতায় ‘এফআরসি’ গঠনে দাতা সংস্থার শর্ত ও তাগিদ (ট্রিগার ) ২০০৩ সাল থেকে। কিন্তু এই আইন বারবার প্রণয়ন শেষ হয়েও শেষ করা যায়নি। আইনের উদ্দেশ্য বিধেয়র মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্যতার প্রশ্নে অস্পষ্টতা, অন্তর্দ্বন্দ্ব, দ্বিধা ও সাংগঠনিক সমস্যা বারবার উঠে আসায় তা প্রণয়ন ও প্রবর্তন প্রলম্বিত হয়েছে। দেশে সংবিধিবদ্ধ নিরীক্ষা ও হিসাব ব্যবস্থা ও পেশা তদারকি প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান থাকতে তার ওপর আরেকটি খবরদারি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছিল। বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের সার্বিক দুর্বলতা এবং এর সক্ষমতা তথা দক্ষতার ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শও ছিল বা আছে। অতীতে অনেক এরূপ সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান এভাবে গড়ে কার্যকর করা যায়নি। বিদেশী পরামর্শ ও শর্ত মানতে গিয়ে শুধু নতুন আইন তৈরি আর সংস্থা নির্মাণ করার যৌক্তিকতা সে নিরীখে ভেবে দেখা দরকার।
বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজস্ব, পুঁজিবাজার, হিসাব নিরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনকানুনগুলো নতুন মলাটে প্রমিতকরণের অনেক কাজ শেষ পর্যায়ে। রাজস্ব আইনের সংস্কারের এ আয়োজন উদ্যোগ সহসা সচকিত নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলছে পরিকল্পনা আর প্রাজ্ঞ পরামর্শকদের প্রয়াস পারঙ্গমতা। আইন সংস্কারের সব উদ্যোগের আগ্রহ অভিপ্রায়ে কোনো কমতি নেই, কিন্তু বিদ্যমান আইনে ‘শতেক শতাব্দী ধরে নামা শিরে অসম্মানভারের’ লাঘব প্রকৃতপ্রস্তাবে ঘটছে কিনা, সংস্কারকৃত আইন কতটা বাস্তবায়ন সম্মত, রাজস্ব আহরণকারী এবং দাতার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা এবং তার রূপকল্প ও তাৎপর্য বিশেষণ আবশ্যকতা থেকে যাচ্ছে। আমরা জানি, চিন্তা থেকে যেমন কাজের উৎপত্তি, আইনের প্রয়োগ তেমনি আইনের দৃষ্টিভঙ্গি ভেদে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। যারা আইন তৈরি করেন তাদের সাথে যাদের ওপর এটির প্রয়োগ হবে তাদের মধ্যেকার সম্পর্কেরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে আইনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে। এখানে তৃতীয় আরেক শরিকের কথাও এসে যায়, যাদের মাধ্যমে আইনটির প্রয়োগ হবে, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, তাদের মনোভাব, মনোভঙ্গি সক্ষমতা অক্ষমতার ব্যাপারটিও বিশেষভাবে বিবেচ্য থেকে যায় আইনের প্রয়োগ তথা বাস্তবায়নযোগ্যতার ক্ষেত্রে। কেননা আইন প্রয়োগের দায়িত্ব আইন প্রণেতার নয়, নির্বাহী বিভাগের। আইন পরিষদ যদি মনে করে এ আইন অন্যের জন্য, পরিষদ সদস্যদের ওপর সবসময় বা সমভাবে বর্তাবে না এবং নির্বাহী বিভাগও যদি ভাবে এ আইন নিজের ওপর ততটা নয় যতটা অন্যের ওপর প্রয়োগের জন্যই, তাহলে যাদের ওপর আইনের প্রয়োগ তারা হয়ে পড়েন প্রতিপক্ষ আইন প্রণেতা ও প্রয়োগকারীর। এই প্রতিপক্ষতার পরিবেশেই আইনের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় নিবর্তনমূলক, প্রতিরোধাত্মক। এই প্রেক্ষাপটে আইন উপেক্ষার, অমান্যের ও অগ্রাহ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
আইন মানুষের জন্য, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য, মানুষ বা প্রতিষ্ঠান আইনের জন্য নয়। মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতির কল্যাণেই আইনের প্রয়োজন। মানুষ আগে, আইন পরে। আইন মানুষকে মুক্তির জন্য, তাকে বন্দী বা বিব্রত করার জন্য নয়। মানুষের মৌলিক অধিকার আইনের আওতায় স্বীকৃত, নিশ্চিত, নির্ধারিত, নিবন্ধিত হয়ে থাকে। মানুষ তার চিন্তার, বিশ্বাসের, শরীরের, দেহের, চলাচলের, সম্মানের ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও নিরাপত্তা দাবি করতে পারে আইনের কাছে। আইন দৃষ্টিভঙ্গিতে সর্বজনীন এবং প্রয়োগে নিরপেক্ষ হওয়ার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। যে আইন যত সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বজনমান্য, সর্বজনবোধ্য, সর্বজন অনুসৃতব্য সে আইন তত কল্যাণকর, সে আইন তত কার্যকর।
বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজস্ব আইনগুলোর সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি হলে দেখা যাবে, এ আইন জন্মগতভাবে ব্রিটিশ, দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে ঔপনিবেশিক এবং প্রয়োগিক দিক থেকে কিছুটা জটিল, নিবর্তন ও প্রতিরোধাত্মক। এ দেশে ভূমিকর বা রাজস্ব আদায়ের প্রথা প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে চলে এলেও এ দেশে আধুনিক কর- আইনগুলো প্রবর্তিত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে। প্রথম থেকেই আদায়ের ক্ষেত্রে করদাতাদের প্রতি বশংবদ অদায়িত্বশীল আচরণ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, ফাঁকিজুকি প্রতিরোধাত্মক ঔপনিবেশিক মনোভাব প্রাধান্য পায়। সব পর্যায়ে পরিপালনীয় বিধিবিধানের ভাষা জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক হয়ে ওঠে। ‘তোমার আয় হোক আর না হোক অর্থাৎ বাঁচো মরো রাজস্ব আমার চাই’ এ ধরনের আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির বদৌলতে কর আদায়কারী বিভাগের সাথে করদাতাদের সম্পর্ক জবরদস্তিমূলক, পরস্পরকে এড়িয়ে চলার কৌশলাভিমুখী হয়ে পড়ে। পরস্পর অবিশ্বাসের ও প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবেশে কর নির্ধারণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে পরস্পরকে এড়িয়ে চলার এবং সে লক্ষ্যে অনৈতিক আঁতাতের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির সংস্কৃতিরও সূত্রপাত ঘটে। দুর্নীতিগ্রস্ততার পরিবেশ সৃষ্টিতে আইনের মধ্যেই যেন রয়ে যায় পরোক্ষ প্রেরণা বা সুযোগ। এমন অনেক আইন আছে যা প্রয়োগ পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে বেআইনি আচরণকে উসকে দেয়।
বিদ্যমান রাজস্ব আইনগুলোর ভাষা ও গতিপ্রকৃতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে গেলে এটা প্রতীয়মান হয়, বছর বছর অর্থ আইনে যেসব ছিটেফোঁটা শব্দগত সংযোজন বিয়োজন তা ধারণ করা ছাড়া সবই মূল ঔপনিবেশিক আইনের ভাব ভাষা দৃষ্টিভঙ্গিগত তেমন কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার দৃশ্যগোচর হয় না। বরং প্রতিবছর কর নির্ধারণ, শুনানি, বিচার-আচারে কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বা এখতিয়ার, কর অবকাশ-নিষ্কৃতি-ছাড় কিংবা বিশেষ সুবিধাবলির ধারা উপধারা সংযোজন বিয়োজন করতে করতে করারোপ, আদায় ও করদাতার অধিকার, কর অবকাশ নিষ্কৃৃতি ও সুবিধাসংক্রান্ত মৌল দর্শন অনেক ক্ষেত্রেই হয়েছে বিস্মৃত। যুগধর্মের সাথে সঙ্গতি রেখে কর নির্ধারণ ও আহরণ আদায় সংক্রান্ত বিধানাবলি সহজীকরণ সরলীকরণ তথা করদাতা বান্ধবকরণ করা না হলে আইন আরো জটিল হতে পারে।
আর এ নিরীখেই রাজন্ব আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি সংস্কারের আওতায় আনা আবশ্যক। স্বেচ্ছায় করদানে সক্ষম করদাতাকে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এমন নিরুৎসাহিতবোধের কারণগুলো শনাক্ত করে উপযুক্ত বা প্রযোজ্য পরিবর্তন আনা এবং সংস্কার করা সেই আইন প্রয়োগেও সব পক্ষের মানসিকতার বা মাইন্ডসেট সমন্বয় প্রত্যাশিত থেকে যাবে। সহজ ও সর্বজন বোধগম্যতার জন্য এসব আইন হতে হবে বাংলা ভাষায়। ইংরেজি ভাষায় প্রণীত আইনের খসড়ার ওপর জনমতামত চাওয়া হয়। অথচ ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রয়োগ আইন পাসের পর দেশের সব আইন বাংলা ভাষায় প্রণয়নের বিধান রয়েছে। বিদ্যমান রাজস্ব আইন স্রেফ পুনর্লিখন এবং কী কী নতুন খাতে কর আরোপ করা হতে পারে (যা প্রতি বছর অর্থ আইনের মাধ্যমে পরিবর্তনযোগ্য) এমন নীতিগত বিষয়কে মতামতের বিষয়ভুক্ত না করে আইনের মৌল দৃষ্টিভঙ্গি তথা দার্শনিকতাকে, দুর্বোধ্য ও দ্ব্যর্থবোধকতাকে, করদাতার দায়িত্ব-কর্তব্য তথা তার মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক বিধিবিধানকে, আইন প্রয়োগের প্রাকরণিক ও পদ্ধতি প্রক্রিয়াসংক্রান্ত ধারা উপধারাগুলোকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আবহাওয়া ও সংস্কৃতিতে গ্রহণযোগ্যতার নিরীখে নির্মাণে মনোযোগী হওয়ার সময় শেষ হয়ে যায়নি। বাইরের থেকে কোনো আইনের কাঠামো ও ভাষ্য চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস নিকট অতীতেও ছিল। তড়িঘড়ি করে কিংবা বাইরের মোসাবিদায় আইন প্রণীত হলে এ সব সমস্যা থেকেই যাবে।
এ দেশের রাজস্ব কিংবা আর্থিক প্রতিবেদন প্রণয়ন নিরীক্ষা ও হিসাব নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইন হবে এ দেশেরই আবহমান অর্থনীতির আবহে লালিত ধ্যান ধারণার প্রতিফলক, হবে সহজবোধ্য, জটিলতা পরিহারী এবং এর প্রয়োগ হবে স্বাচ্ছন্দ্যে সর্বজনীন ব্যবহার উপযোগী। তবেই বাড়বে এর গ্রহণ এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা। অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থানরত করদাতারা যেন অভিন্ন আচরণে আইনগতভাবে কর প্রদানে দায়িত্বশীল হতে স্বতঃস্ফূর্ততা বোধ করেন। কর ‘আদায়’ নয় কর আহরণে করদাতা ও কর আহরণকারীর মধ্যেকার দূরত্ব যত কমে আসবে, যত অধিকমাত্রায় করদাতা কর নেটের আওতায় আসবেন, তত কর রাজস্ব আহরণে সুষম, সহনশীল ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটবে। এরূপ পরিস্থিতিতে করদাতাকে তাড়া করে ফেরার মতো স্পর্শকাতরতার অবসান ঘটবে।
লেখক : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close