মঙ্গলবার ২২ অগাস্ট ২০১৭


অর্থমন্ত্রী মুহিতের পদত্যাগ কি আসন্ন?


সংবাদ সমগ্র - 20.06.2017

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পদত্যাগ কি আসন্ন? নতুন অর্থবছরের বাজেট নিয়ে গোটা দেশজুড়ে কঠোর সমালোচনার মধ্যে পড়েছেন অর্থমন্ত্রী। আবগারি শুল্ক আরোপ ও ভ্যাট আইন নিয়ে বিতর্ক এখন সবার মুখে মুখে। এমনকি সরকারের নীতিনির্ধারকরা সংসদে অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করে গত কয়েকদিন ধরে বক্তব্য দিচ্ছেন। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিতর্কিত ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ফলে অর্থমন্ত্রী মুহিতের পদে থাকা নিয়ে নানামুখী গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারকে সমালোচনার মুখোমুখি করায় তার ওপর ক্ষুব্ধ নিজ দলের নেতারাও।

ক্ষুদ্রঋণে দরিদ্রতা বিমোচন হয়েছে দাবি করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসের প্রশংসা করায় গত মার্চ মাসে তার কড়া সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট থেকে দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের সমালোচনা করে মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব ও জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় মুহিতের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করারও দাবি তুলেছেন তিনি।

মুহিতের উদ্দেশে বিরোধী দলের এই সংসদ সদস্য বলেন, আপনি বিদায় নিন। পদত্যাগ করুন। সম্মানের সাথে বিদায় নিন। আপনার অনেক বয়স হয়েছে। আপনাকে সম্মান করি। বিদায় নিয়ে ষোল কোটি মানুষকে মুক্তি দিন। খেলাপী ঋণ আদায় হলে ভ্যাট বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না বলেও মনে করেন বাবলু।

মঙ্গলবার জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বাজেট নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে মুহিতকে উদ্দেশ করে বলেন, অর্থমন্ত্রীর কাছে আমরা ক্ষমা চাই। আপনার কাছে আমরা আর বাজেট চাই না।

ফিরোজ রশীদ বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছেন এটা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজেট। কিন্তু এটা মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। আমার মতে এই বাজেট হচ্ছে ২০১৭ সালে জনগণের জন্য শ্রেষ্ঠ তামাশা। এটা কোনো বাজেট হয়নি। ব্যাংকে আমানতে আবগারি শুল্ক আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আবগারি শুল্ক ধরা হয় মদ-গাঁজা-আফিম-ভাং-বিড়ি-সিগারেট-তামাকের উপর। আমার নিজের টাকা আমি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখছি, তার উপর কর বসিয়ে দিলেন!

এর আগে গত ৮ জুন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ সংসদে বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, সরকারি ব্যাংকের অর্থ লুটপাট, শেয়ারবাজারের লুটপাটকারীদের পাহারাদার আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত বছর বাজেট বক্তব্যে তিনি সংসদে বলেছিলেন, বাংলাদেশ রিজার্ভ চুরি নিয়ে বিবৃতি দেবেন। তিনি কথা করেননি। ড. ফরাস উদ্দিনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেননি। সংবাদ সম্মেলন ডেকেও আসেননি। মূলত লুটেরাদের পাহারাদার হিসাবে কাজ করতে গিয়েই তিনি এসব করেননি। পীর মিসবাহ বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোতে জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা আত্নসাত করা হচ্ছে। তাদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। বরং মূলধন সরবরাহ করে লুটপাটে উৎসাহিত করেছেন অর্থমন্ত্রী।

সোমবার সংসদ অধিবেশনে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেন।

অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে ফজলুল করিম সেলিম বলেন, আপনার দায়িত্ব বাজেট পেশ করা। এই সংসদের ৩৫০ জন জনগণের প্রতিনিধি ঠিক করবেন জনগণের কল্যাণে কোনটা থাকবে, কোনটা থাকবে না। আপনি একগুঁয়েমি সিস্টেম বন্ধ করেন, কথা কম বলেন। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর কিছু কথাবার্তায় সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। আগেও তিনি অর্থমন্ত্রীকে কথা কম বলার পরামর্শ দিয়েছেন জানিয়ে সেলিম বলেন, আপনার বয়স হয়ে গেছে, কখন কী বলে ফেলেন—ঠিক থাকে না।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, বাজেট নিয়ে সারা দেশে আলোচনার ঝড় চলছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এটা নির্বাচনী বাজেট নয়। তাহলে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কবে নির্বাচনী বাজেট দেবেন? আবগারি শুল্ক আগের অবস্থায় রাখার দাবি জানিয়ে হানিফ বলেন, অর্থমন্ত্রী কী কারণে, কার স্বার্থে ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক করেছেন, জানা নেই। তিনি বলেন, হলমার্কের চার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির পর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, এ টাকা কিছু নয়। তাহলে কেন সামান্য টাকার জন্য সারা দেশে মানুষের মধ্যে আক্ষেপ তৈরি করলেন।

লাখ টাকার ওপর ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি এবং সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর প্রস্তাব দেয়ায় গত বৃহস্পতিবার সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কঠোর সমালোচনা করেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। এই দুই উদ্যোগে যে কয় টাকা আসবে তা সরকারের জন্য ‘পিনাট’ (বাদাম) এর মত বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, কী করে আমরা এদেরকে বিত্তবান বলবো। দুই টাকার পর পাঁচ টাকার কারেন্সি সরকার যেখানে উঠিয়ে নিচ্ছে তখন এই লাখ টাকা তো মহারানি ভিক্টোরিয়ার আমলের টাকা নয়। এই টাকা থাকলে ঘিয়ের বাতি জ্বালাত, তাদের সাথে আমাদের তুলনা করে লাভ নাই।

সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, আগামী নির্বাচনে আল্লাহ তাঁকে (অর্থমন্ত্রী) সুযোগ দেবে কি না জানি না। কিন্তু যাদের আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেবে, তারা যাতে নির্বাচন করতে পারে সেটা খেয়াল করতে হবে।

সঞ্চয়পত্রের ওপর বাড়তি কর আরোপ করায় অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করে গত ৭ জুন সংসদে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। সঞ্চয়পত্রে বাড়তি কর আরোপ করা হয়েছে, যা মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফ বলেন, আপনি কথায় কথায় এত ‘এক্সাইটেড’ (উত্তেজিত) না হয়ে তাদের (ব্যবসায়ীদের) সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলেন। তাদের সঙ্গে বসে মূল্য সংযোজন করের ব্যাপারে একটি বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেন। আমরা সবাই মিলে সমন্বিতভাবে বাজেট কার্যক্রমটা সফল করব।

গত এপ্রিল মাসে সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আই উইল রিটায়ার ইন টু থাউজ্যান্ড এইটটিন। আই থিংক ইট উইল বি গুড টাইম। দ্যাট টাইম আই উইল বি এইটি ফাইভ’ (আমি ২০১৮ সালে অবসরে যাব। আমি মনে করি, এটা একটা ভালো সময়। তখন আমার বয়স হবে ৮৫)। এভাবেই মন্ত্রিত্ব ছেড়ে নিজের অবসরে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এর আগে গত বছরের ৫ জুন সিলেটের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ২০১৯ সালে তিনি রাজনীতি থেকে বিদায় নেবেন। সেই অনুযায়ী আগামী বাজেটই হবে তার শেষ বাজেট। সে সময় তিনি তার উত্তরসূরি হিসেবে ভাই ড. আবদুল মোমেনের কথা বলেছিলেন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৫ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিনি দেশে ফেরেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনার মধ্যে সিলেটের উন্নয়ন নিয়ে দুই দফা সংবাদ সম্মেলনও করেন ড. মোমেন। তবে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ তাঁকে প্রত্যাখান করেছে বলে জানান দলের নেতাকর্মীরা।

এরই মাঝে গত ৯ জুন সিলেটে এক অনুষ্ঠানে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসন থেকে ফের প্রার্থী হওয়ার কথা জানান অর্থমন্ত্রী।

এই আসনে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিলেটের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের নাম বিকল্প প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। নির্বাচনে আগ্রহী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজও।




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close