সোমবার ২৩ অক্টোবর ২০১৭


কাক কাকের মাংস খায়না, জানেন কি সৌদি বাদশাহ


সংবাদ সমগ্র - 06.06.2017

রাশিদ রিয়াজ : ওসামা বিন লাদেনের জন্ম সৌদি আরবেই। এখনো আইএস জঙ্গিদের সঙ্গে যে সব বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট তরুণ অস্ত্র হাতে সন্ত্রাস করছে তাদের সিংহভাগ সৌদি নাগরিক। তারপরও সৌদি ক্যাবিনেট বলছে, আন্তর্জাতিক আইন মেনেই কাতারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করা হয়েছে। নাটকীয় মনে হলেও হঠাৎ করে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি এবং তা পূর্বপরিকল্পিত তার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে আরব ও পশ্চিমা মিডিয়ায়।

সন্ত্রাসের অভিযোগ থাকলে কাতারের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি সৌদি আরব সহ সম্পর্কত্যাগী দেশগুলো। কাতার এয়ারলাইন্স বিশ্বে সেরা এয়ারলাইন্স হিসেবে পশ্চিমা এয়ারলাইন্সগুলোর দীর্ঘদিনের প্রতিযোগী হিসেবেই অবস্থান করছিল। জাতিসংঘের অনুমোদন না নিয়ে ইয়েমেনের মত দুর্বল দেশে যে দেশ সামরিক আগাসন চালিয়ে এ পর্যন্ত ১২ সহ¯্রাধিক নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে, দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছে, সেই সৌদি আরব সন্ত্রাসের এক অভিযোগেই কাতারের মত দেশের বিরুদ্ধে এতবড় সদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নয়। এ কারণেই এ সিদ্ধান্তে ইসরায়েল স্বাগত জানিয়েছে। আল-জাজিরার মত একটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সৃষ্টি করেছে কাতার যা পশ্চিমা মিডিয়ার বিকল্প মিডিয়া হিসেবে ইতিমধ্যে একটি আসন নিয়েছে।
দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম রমজানের মত পবিত্র মাসে কাতারের বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেশটির একমাত্র স্থল সীমান্তে হাজারো খাদ্যপণ্যবাহী ট্রাক আটকে আছে। বরাবরের মত ওআইসি নিশ্চুপ। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন এধরনের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত ও কাতারের পাশে দেশটির অবস্থান নিশ্চিত করছেন কেন? কাতার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন ও অনায্য বলে যে দাবি করছে সে নিয়ে কোনো আলোচনার প্রয়োজন কেন মনে করছেন না মুসলিম উম্মার অভিভাবক হিসেবে পরিচিতি পেতে ইচ্ছুক সৌদি বাদশাহ।
আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, অন্তত ৩টি লক্ষ্য নিয়ে কাতারের বিরুদ্ধে এধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক, কাতারের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন। সৌদি আরব সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার পর কাতারের ৮৫ ভাগ আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। ৯০ ভাগ খাদ্য আমদানির ৪০ ভাগই আসে সৌদি আরব থেকে। অন্যকোনো দেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত নেই বলে আকাশ বা জলপথে আমদানি ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ। এরফলে কাতারের বাজারে যে খাদ্যঘাটতি হবার আশঙ্কা রয়েছে তা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। ইয়েমেন, সিরিয়া বা ইরাকের মত একটি ধ্বংসের প্রান্তরে কাতারকে নিয়ে যেতে পারলে আগামী বিশ্বকাপ ফুটবল তো দূরের কথা কাতারের জনসংখ্যার ৯০ ভাগ বিদেশি নাগরিক নিজেদের ব্যবসা গুটিয়ে তারা নিজ দেশে ফিরতে শুরু করবেন। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কাতারকে ঘিরে ধরবে।
কাতারের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরণগুলো লক্ষ্য করার মত, কাতার সব সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন করছে, কাতারের উচিত নয় মধ্যপ্রাচ্যকে ‘স্যাবোটাজ’ করা, কাতারকে ইরানের পাশে থেকে সরে আসতে হবে ইত্যাদি। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মত একই সুরে সৌদি আরবের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কাতারের বিরোধিতা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি আরবের স্বার্থ যিনি নিশ্চিত করেন, সেই সৌদি আমেরিকান পাবলিক রিলেশন এ্যাফেয়ার্স কমিটির প্রেসিডেন্ট সালমান আল আনসারি টুইট বার্তায় কাতারের আমিরকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত ও দুই পবিত্র মসজিদের অভিভাবকের সঙ্গে অসদচারণ করলে, আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই মিসরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিও তাই করেছিলেন এবং তিনি পদত্যাগ করার পর কারারুদ্ধ হয়ে আছেন।
কাতার শুধু মিসরের নির্বাচিত মুরসিকে সমর্থন করেনি, দেশটির আল-জাজিরা টেলিভিশন সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনে কি হচ্ছে তার সঠিক প্রামান্যচিত্র প্রচার করছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের গোস্বা হওয়ার কথা। তারপর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করার পরও নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সামরিক স্বৈরশাসক বসিয়ে মিসরের পরিস্থিতি বাগে আনা যায়নি, লিবিয়ায় ৩টি সরকার পরিবর্তন হওয়ার পরও স্থিতিশীল পরিস্থিতি আসেনি, ইয়েমেনের রাজধানী সানা এখনো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে, এ বিষয়গুলো সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদের কাছে ভাল লাগে না। সিসি, সালমান, জায়েদের শাসন অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কা মধ্যপ্রাচ্যে আরো প্রবল হয়ে উঠছে। অতএব সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে কাতারের মত একটি আরব রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার আয়োজন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয় তা দূর করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর ভর করতে চাইছেন বিন সালমান, বিন জায়েদের মত ক্রাউন প্রিন্স শাসকরা। নিজেদের দেশে যে চাপা বিরোধ ও বিক্ষোভ রয়েছে তা শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্যে অতীতের মত ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ার মত নতুন ফ্রন্ট খুলতে চাচ্ছেন তারা। কাতারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি তাই প্রয়োজন। তুরস্ক এখনো ইউরোপীয় দেশ হিসেবে আঞ্চলিক শক্তিসম্পন্ন, ভারসাম্যের কৌশলে ইরান এগিয়ে, ইরাকে আইএস জঙ্গি কোনঠাসা, ক্রমশ জনগণের শাসন হিসেবে নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে যা এক মহাভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এরই নাম মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে সন্ত্রাস।
স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র কাতার যদি নিজে থেকেই ইতিহাসে বিলীন হয়ে যায়, রাজতন্ত্র, সামরিক কায়দার স্বৈরশাসক ও পরাশক্তির লেজুড়বৃত্তিকারী দেশগুলো সে লক্ষ্যেই কাতার অপারেশনের মত নতুন এক অভিযান শুরু করেছে। এও স্পষ্ট হয়ে উঠছে কেন আমিরাত ওয়াশিংটনে কাতার থেকে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের ফরওয়ার্ড বেস অন্যত্র স্থানান্তরে জোর প্রচারণা চালিয়ে আসছে। তাহলে কাতারের শাসন ব্যবস্থার কি ধরনের পরিবর্তন চান মধ্যপ্রাচ্যের শাসকরা? মার্কিন ঘাঁটি কাতার থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রচারণার সঙ্গে এই শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া কোনো কিছুর সঙ্গে কি মিল আছে? রিয়াদের অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্লগাররা ইদানিং আরব উপদ্বীপের এ অংশের নির্বাচিত শাসক হিসেবে আল-থানি পরিবারকে নির্বাচন করার জন্যে ব্রিটিশদের ভূমিকা স্মরণ করছে। তারা এখন মনে করছেন, কাতারে গোত্রপ্রধান শাসক ও রাজ পরিবারগুলের মধ্যে যে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সমীকরণ রয়েছে তা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যদেশগুলোর মধ্যেও সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। ক্ষমতা হস্তান্তরে পিতা তার বড় ছেলে নাকি যোগ্যতর ছেলেকে বেছে নেবেন, এছাড়াও তেল রাজস্বের ৪০ শতাংশ আল-থানি রাজ পরিবারে ভাগ করার বিষয়টি অনুকরণযোগ্য হলে রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সংকট সৃষ্টি করতে পারে। সৌদি দৈনিক আল ইকতিসাদিয়ায় এসব নিয়ে বিস্তর প্রবন্ধ দেখা যায়।
এমনিতে সৌদি রাজকীয় পরিবারের কোনো চিন্তাশীল সদস্যের জন্যে কিছু বিষয় মনগড়াভাবে বিপজ্জনক। যেমন সৌদি রাজতন্ত্র ব্রিটিশ ইম্পেরিয়ালের সমর্থন ছাড়া কি বিকল্প কোনো সমর্থনে চলতে পারে? সম্প্রতি সৌদি সফরে কিং আব্দুল আজিজ যাদুঘরের পাশেই দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি বাদশাহ সালমানের সঙ্গে তরবারি নৃত্য দিলেন। ওই যাদুঘরে এক বৃটিশ নারী গার্টরুড বেলের ছবি শোভা পাচ্ছে যিনি সৌদ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। এই মহান বৃটিশ নারী প্রতœতাত্ত্বিক, তার বয়সের সর্বশ্রেষ্ঠ পর্বতারোহী ও রাজকীয় ব্রিটেনের একজন রাজনৈতিক কর্মকর্তা ছিলেন। স্টেট অব মেসোপটেমিয়া বা ইরাক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও আরবে গোত্রপ্রধানদের ফিরিয়ে আনতে তার একটি মুখ্য ভূমিকা ছিল। বেল ইবনে সৌদের শাসনে কিং আব্দুল আজিজের যে লোভনীয় ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের বর্ণনা দিয়েছিলেন তা ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সফরে সৌদি আরবে ইভানকা ট্রাম্প কি অতীতের ব্রিটিশ নারী গার্টরুড বেলের প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠছেন? ইভানকা সৌদি সফরের সময় ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স বিন সালমান সম্পর্কে চমৎকার সব প্রশংসা করেছেন। তার মানে ব্রিটিশ বা মার্কিন যেকোনো শাসকদের প্রশংসা মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের জন্যে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। শত বছরের ব্যবধানে তার কোনো তারতম্য হয় না।
সরকারিভাবে সৌদি আরবে বেকারত্বের হার ১২ শতাংশ হলেও বেসামরিক হিসেবে তা ২৫ শতাংশের বেশি। কাতারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্ণ কর্মসংস্থানের নজির রয়েছে। নাগরিকদের ভোটের অধিকার দেওয়া হয়েছে। কাতারের মাথা পিছু আয় ১ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলার যা সৌদি আরবের ৩ গুণ বেশি। ভিন্নতর কাতার ও তার আর্থসামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সন্ত্রাসের ভূত বলে মনে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রের শাসকদের কাছে?
মজার ব্যাপার হচ্ছে সৌদি আরবের শাসকদের বিদেশি নারীদের প্রতি আসক্তির কেনো পরিবর্তন হয়নি। যদি কিং আব্দুল আজিজের জন্যে ব্রিটিশ নারী গার্টরুড বেলের সুপারিশ প্রয়োজন হয় তাহলে তার নাতি সালমানের কেনো ইভানকা ট্রাম্পের সমর্থন প্রয়োজন কেন হবে না? রিয়াদের দৈনিকগুলো এসব সচিত্র প্রতিবেদন অকাতরে প্রকাশ করছে। ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্সকে ‘ইফেক্টিভ রোল মডেল’ নেতৃত্বের উচ্চাকাঙ্খা, জনগণের প্রতি দরদ ও দেশপ্রেমিক নানা অভিধায় অভিযুক্ত করতে হয়েছে ইভানকাকে। অথচ ইভানকা যখন এমন ধারা বর্ণনা দেন তখন সৌদি নারীরা তার ছায়া হয়েই থাকেন। কোনো সৌদি নারী ইভানকার মত কর্মচঞ্চল হওয়ার সুযোগ পাননি। ইভানকার সঙ্গে কথা বলা যদি হালাল হয়ে থাকে তাহলে সৌদি নারীদের সে ভূমিকায় নিয়ে আসা নাজায়েয হয় কিভাবে?
কি বিন সালমান, কি বিন জায়েদ তারা তো ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় আটকে আছেন। তারা গোত্রপ্রধান শাসক ধরনের। নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখতে তেল সম্পদ কমদামে বিক্রি ও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনে পরাশক্তি দেশগুলোকে খুশি রাখতে অভ্যস্ত। তারা চক্রান্ত করতে পারেন, দমন করতে পারেন কিন্তু তারা সুশাসন, নির্বাচন, গণতন্ত্র দেখে ভয় পান। কারণ তাদের নজর নিজেদের দিকেই। কাতার যদি এর বিকল্প হয় তাহলে তার পরিণতি সিরিয়া বা ইয়েমেনের মত করতে আরব দেশগুলোর হাত কাঁপবে কেন? কিন্তু আশাবাদ বেঁচে থাকে এজন্যে যে তারা ক্ষয়িষ্ণু হয়ে উঠছেন, স্বাশাসিত ও আধুনিক আরবরা অবশেষে বেরিয়ে আসবে।




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close