সোমবার ২৩ অক্টোবর ২০১৭


ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের মেলা


সংবাদ সমগ্র - 26.05.2017

আনিসুল হক : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট ক্যাম্পাসে এক সকালে বসেছিল ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সমাধানের আসর। ১৪ মে ২০১৭ প্রথম আলোয় এই খবর আমরা পাঠ করেছি। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরুর দেড় ঘণ্টা আগে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্র নিয়ে হাজির হয় জন পঞ্চাশেক পরীক্ষার্থী আর তাদের অভিভাবকেরা। নানা উপদলে ভাগ হয়ে তারা প্রশ্নের সমাধান জেনে নেয় বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো ছাত্রের কাছ থেকে। কাগজে লেখা হয়েছে, অর্থের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো শিক্ষার্থী এই কাজ করেন। পরীক্ষার্থীরা প্রশ্নপত্র আনে স্মার্টফোনে। তারা সেটা পায় ফেসবুকে বা ম্যাসেঞ্জারে। পরে দেখা যায়, এই প্রশ্ন মিলে গেছে পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে।

বাংলাদেশে এখন উৎসব বা ফেস্টিভ্যালের হুজুগ চলছে। আম উৎসব, পিঠা উৎসব, সংগীত উৎসব, অমুক ফেস্ট। আছে মেলা—বৃক্ষমেলা, পাখিমেলা। এর সঙ্গে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্র মেলা যুক্ত হতে পারে। পরীক্ষার আগে এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে। ভেন্যুতে প্রবেশের জন্য উচ্চমূল্যের টিকিট কিনতে হবে। শাহরুখ খান বা সালমান খানের কনসার্ট দেখতে লাখ লাখ টাকার টিকিট যারা কিনতে পারে, ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্রের মেলায় যেতে তারা দামের দিকে তাকাবে না, টিকিট তারা কিনে ফেলবেই। কাজেই এই মেলার আয়োজকেরা যে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমি জানি, আমার এই আইডিয়াটার বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ। তাহলে গোপনীয়তা বজায় রেখেই এই মেলা বা উৎসব আয়োজন করা যেতে পারে। এটার নাম দেওয়া যেতে পারে ‘সাকসেস মেলা’। সাফল্য উৎসব। এটার প্রচারের জন্যও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে।

আমাদের কর্তাব্যক্তিরা প্রথম দিকে স্বীকার করতে চাইতেন না যে প্রশ্নপত্র আদৌ ফাঁস হয়। এখন করেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এখন বলছেন, একশ্রেণির শিক্ষক প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। সকালবেলা প্রশ্নপত্র পেয়ে তাঁরা ফোনে ছবি তুলে পাঠিয়ে দেন পরীক্ষার্থীদের কাছে, অর্থের বিনিময়ে। এই শিক্ষকেরা সারা বছর ক্লাসে পড়ান না, বাড়িতে তাঁদের বিকল্প ক্লাসরুম আছে, শিক্ষার্থীরা সেখানে স্যারদের টাকা দিয়ে পড়াশোনা করে।

আমি ভাবি, আমাদের নৈতিকতার মান নিয়ে। শিক্ষকেরা প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন, টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র বিক্রি করেন। অভিভাবকেরা ছোটেন সেই প্রশ্নপত্র জোগাড়ের জন্য, হাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই সব প্রশ্নপত্রের সমাধান বাতলে দেন, তা–ও টাকার বিনিময়ে।

এবং আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, এই অবস্থায় পড়লে আমি কী করতাম? আমি যদি একজন পরীক্ষার্থী হতাম, আর আমার ম্যাসেঞ্জারে যদি প্রশ্নপত্র এসে যেত, আমি কি তা দেখতাম, নাকি দেখতাম না। আমি যদি পরীক্ষার্থীর অভিভাবক হতাম, তাহলে আমি কী করতাম?

আমি শিক্ষার্থীদের দোষ দেব না, আমি বলব, এটা আমাদের ব্যবস্থার দোষ, সিস্টেমের দোষ। কিন্তু তারপরও বলব, এই সব ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের কর্তব্য হবে, প্রশ্নপত্র না দেখা, ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্রের পেছনে না ছোটা। এটাই ব্যক্তি-পরীক্ষার্থীর একমাত্র কর্তব্য। অভিভাবকদেরও উচিত হবে প্রশ্নপত্র জোগাড়ের চেষ্টা না করা, এটাকে নিরুৎসাহিত করা। পরীক্ষার্থী সারা বছর বা দুই বছর বা দশ বছর ধরে যে প্রস্তুতি নিয়েছে, তারই ভিত্তিতে যাবে পরীক্ষার হলে। সে যা ভালো মনে করে, তা লিখবে।

আমি ফেসবুক লাইভে এই পরামর্শ দিই। তখন কমেন্টসের ঘরে এই রকম কথা লেখা হয়, আমার সারা জীবনের শখ ছিল আমি ইঞ্জিনিয়ার হব, আমি তো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির সুযোগ পাব না, যারা প্রশ্নপত্র আগেভাগে পেয়ে গেছে, তারা ভালো করবে।

আমি তাদের বলব, ইঞ্জিনিয়ারই-বা তোমাকে হতে হবে কেন? একবার আমি রাজধানীর একটা বালিকা বিদ্যালয়ে ক্লাস এইটের শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করলাম, তোমরা কারা কারা ডাক্তার হতে চাও। প্রায় সবাই হাত তুলল। হায় হায়, সবাই ডাক্তার হলে রোগী হবে কে?

ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়াও পৃথিবীতে আরও বহু পেশা আছে। সেসব পেশায় সাফল্য ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের চেয়ে বেশি ছাড়া কম নয়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান কিংবা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বাংলার ছাত্র ছিলেন। বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান পড়েছিলেন ইতিহাস। হ‌ুমায়ূন আহমেদ পলিমার কেমিস্ট্রি।

বিবিসি বাংলা একবার জরিপ করেছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কারা। মানুষ ভোট দিয়ে একটা তালিকা প্রণয়ন করেছিল। তাতে এক নম্বরে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, দুই নম্বরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিন নম্বরে কাজী নজরুল ইসলাম। কুড়িজনের মধ্যে একজনও তো দেখি না ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। বিজ্ঞানী আছেন একজন, জগদীশচন্দ্র বসু। মাঝেমধ্যে অনলাইনে বা অর্থনীতির কাগজগুলোতে বাংলাদেশের সেরা ধনীদের তালিকা দেখি—তাতেও কোনো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের নাম দেখি না। তাহলে আমরা সবাই খালি ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ার কেন হতে চাই। ইদানীং নাকি বিজ্ঞানে ছেলেমেয়েদের উৎসাহ নেই, তারা বিবিএ-এমবিএ পড়তে চায়! এটাও আরেক যন্ত্রণা।

মানে আমাদের শিক্ষার একটাই উদ্দেশ্য—জুড়িগাড়ি চড়া। শিক্ষার্থীরা বাণিজ্য পড়তে চায়, তার মানে তারা অর্থ উপার্জন করতে চায়। মানুষ হওয়া এ দেশে শিক্ষার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা সিএ তাকে হতেই হবে। এ জন্যই মা-বাবা সন্তানদের নিয়ে ছুটছেন এক কোচিং সেন্টার থেকে আরেক কোচিং সেন্টারে, ছুটছেন ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের পেছনে, ছুটছেন কী করে সন্তানকে ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি করানো যায়, তার মন্ত্রগুপ্তির সন্ধানে।

এখানে আগে এ পি জে আবদুল কালামের জীবনের ঘটনাটা আরেকবার বলে নিই। এ পি জে আবদুল কালাম হতে চেয়েছিলেন বিমানবাহিনীর পাইলট। দেরাদুনে গিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। অল্পের জন্য টিকতে পারেননি। তখন তাঁর মনে হলো, জীবনের কোনো মানে নেই। সারাটা জীবন আমি হতে চেয়েছি বিমানবাহিনীর পাইলট, আর সেই ভর্তি পরীক্ষায় আমি ব্যর্থ হলাম। তিনি একটা নদীর ধারে বসে ভাবছেন, এই জীবন নিয়ে আমি কী করব। তখন একজন সাধুর দেখা পেলেন তিনি। সাধু বললেন, কী হয়েছে, তোমার মন খারাপ কেন? এ পি জে আবদুল কালাম বললেন, আমার জীবন ব্যর্থ হয়ে গেছে, আমি বিমানবাহিনীতে সুযোগ পেতে ব্যর্থ হয়েছি। সাধু তাঁকে বললেন, এর মানে নিয়তি তোমার জন্য বিমানবাহিনী নয়, অন্য কিছু নির্দিষ্ট করে রেখেছে। তুমি তা-ই হওয়ার চেষ্টা করো। দেখবে, তাতে তুমি ভালো করবে। এ পি জে আবদুল কালাম ভারতের সেরা বিজ্ঞানীদের একজন হয়েছিলেন, হয়েছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি।

কাজেই যে ছেলেমেয়েরা প্রশ্নপত্র দেখবে না, পরীক্ষা দেবে, ফল যা-ই হোক না কেন, জীবনের পরীক্ষায় তারা ভালো করবে। কারণ, তারা ভালো মানুষ হবে। নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হবে।

দ্বিতীয় প্রসঙ্গ শিক্ষকদের নৈতিকতা নিয়ে। শিক্ষামন্ত্রী আমাকেও বলেছেন, আমাদের শিক্ষকদের কেউ কেউ জড়িত প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে। বলেন, এই শিক্ষকদের নিয়ে আমরা কী করব?

মাত্র পরশু আমি গিয়েছিলাম ইস্পাহানী বালিকা বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে। অধ্যক্ষ ড. মারুফী খান। আমি অভিভূত হয়ে তাঁর বক্তব্য শুনলাম। তিনি বললেন তাঁর জীবনের একটা কাহিনি। তাঁর এক ছাত্র, কাতার থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে স্ট্যান্ড করেছিল। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সময় সে ছিল দেশে। তিনি তাঁর প্রিয় শিক্ষার্থীকে দেখতে তার বাসায় চলে যান। দেখেন, ছেলে পড়ছে না, নাটক দেখে বেড়াচ্ছে। পরীক্ষার সকালে আবার শিক্ষিকা গেলেন ছাত্রের খোঁজ নিতে। ছাত্র বলছে, পরীক্ষা দেব না। কারণ, মা-বাবার আশা পূরণ করতে পারব না, স্ট্যান্ড করতে পারব না। মারুফী খান বললেন, মা-বাবার প্রত্যাশার চাপ শিক্ষার্থীদের ওপরে অনেক সময় বড় বোঝা হয়ে ওঠে। তিনিও জোর দিলেন লেখাপড়ার পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চার ওপরে, কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের ওপরে।

যা-ই হোক, মারুফী খানের বক্তব্য শুনে আমি মুগ্ধ। ভাষা প্রতিযোগ, কিশোর আলোর অনুষ্ঠান কিংবা গণিত অলিম্পিয়াড করতে বিভিন্ন স্কুলে যাই। স্কুলগুলোও অনেক সময় ডাকে, সব সময় না করতে পারিও না। তখন অনেক শিক্ষককে দেখি, তাঁদের কথা শুনি, তাঁদের জানাশোনা-বোঝার পরিধি দেখে মাথা নুয়ে আসে, অভিভূত হই। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল কলেজের বাংলার শিক্ষিকা, এখন এলপিআরে আছেন, ফেরদৌস আরা। ভাষা প্রতিযোগে শিক্ষার্থীরা যখন জটিল জটিল প্রশ্ন করে, তিনি তার উত্তর দেন। আমি
হাঁ হয়ে শুনি। কী চমৎকার করে বলেন। বাংলা ভাষা, তার কাঠামো, তার ব্যাকরণে এই শিক্ষকের ধারণা একেবারেই স্বচ্ছ। এ রকম বহুবার হয়েছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের কথা শুনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছি। ছাত্রদের মধ্যেও সাংঘাতিক সব উজ্জ্বল মুখ দেখতে পাই। তারা যে প্রশ্ন করে, তা শুনেই বোঝা যায়, তারা বহু কিছু গভীরভাবে ভাবে, তাদের মনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়, তা সমাধান করার জন্য তারা ব্যাপক পড়াশোনা করে।

রংপুর জিলা স্কুলের আবদুল আলীম স্যার কিংবা সিরাজ স্যারের কথা মনে পড়ে। আবদুল আলীম স্যার স্টেডিয়াম বানান মূর্ধন্য ষ দিয়ে লিখেছিলাম বলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভেনশনের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ইংরেজি এস-এর বাংলা দন্ত্য স হবে। সিরাজ স্যার চলতি বাংলা প্রবর্তন করেছিলেন, চমৎকার ছিল তাঁর ভাষাভঙ্গি আর অপরূপ সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করতেন, পরিচালনা করতেন।

আদর্শবাদী শিক্ষকও নিশ্চয়ই এখনো অনেক আছেন, ভীষণ জানেন-বোঝেন এমন শিক্ষকও। কিন্তু সিস্টেম বা ব্যবস্থা সব শেষ করে ফেলছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস সমস্যার সমাধান যদি সরকার করতে না পারে, দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ভবিষ্যতের ডাক্তাররা ভুল ওষুধ লিখবেন, সেতু ভেঙে পড়ে যাবে, তার চেয়েও বড় কথা, নীতি-নৈতিকতা বলতে কিছুই থাকবে না। তা যদি আমরা মেনে নিতে প্রস্তুত থাকি, তাহলে প্রশ্নপত্র ফাঁস উৎসব প্রকাশ্যে আয়োজন করলেই তো পারি।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।




Loading...
সর্বশেষ সংবাদ


Songbadshomogro.com
Contact Us.
Songbadshomogro.com
452, Senpara, Parbata, Kafrul
Mirpur, Dhaka-1216


close